Tuesday, 01 September, 2026

তীব্র জ্বালানি তেলের সংকটে জেলেরা মাছ ধরতে পারছে না


জ্বালানি সংকটে জেলেরা মাছ ধরতে পারছে না

শরীয়তপুর জেলায় তীব্র জ্বালানি তেলের সংকট নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় স্থবিরতা এনে দিয়েছে। টানা দুই দিন বন্ধ থাকার পর শুক্রবার সীমিত পরিসরে তিনটি পাম্প চালু হলেও পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের অভাবে পাম্প মালিকদের রেশনিং করতে হচ্ছে। এতে পথে বসেছেন প্রায় ৩৩ হাজার জেলে। পদ্মার বুকে নিষ্প্রাণ পড়ে আছে হাজার হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার জেলার সব কটি ফিলিং স্টেশন বন্ধ ছিল। শুক্রবার সকালে সীমিত পরিমাণ তেল নিয়ে তিনটি পাম্প চালু হলেও সাধারণ ক্রেতাদের স্বস্তি মেলেনি। মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা, প্রাইভেট গাড়িতে ১ হাজার টাকা, পাবলিক পরিবহনে ৫ হাজার টাকা এবং কৃষক ও জেলেদের জন্য সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ হাজার টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। দীর্ঘ লাইন থাকলেও অনেক ক্রেতা খালি হাতে ফিরছেন।

অন্যদিকে, পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ও ভিআইপিদের জন্য তারা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ লিটার তেল সংরক্ষণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শরীয়তপুর সদরের গ্লোরি পেট্রোল পাম্পের ব্যবস্থাপক অজিত হালদার বলেন, “যদি আমরা দিতে অস্বীকৃতি জানাই, তারা সমস্যা তৈরি করে, হুমকি দেয়।” সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে এই বৈষম্য নিয়ে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।

আরো পড়ুন
অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সফল মৎস্য খাত, এবার নজর বিশ্ববাজারে রপ্তানি বাড়ানোয়: জাতীয় মৎস্য পক্ষের সমাপনীতে মৎস্য প্রতিমন্ত্রী

বাংলাদেশ বর্তমানে মাছের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সম্পূর্ণ সক্ষমতা অর্জন করেছে উল্লেখ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, Read more

দেশের অব্যবহৃত জলাশয় সংস্কার করে তরুণদের মধ্যে বন্টন করা হবে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দেশের মৎস্য খাতকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক ও কর্মসংস্থানমুখী করতে সরকারি জলমহাল, অব্যবহৃত পুকুর, হাওর-বাঁওড় ও জলাশয় সংস্কার করে স্থানীয় বেকার Read more

সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন পদ্মাপারের জেলেরা। জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রায় ৩৩ হাজার জেলের বাস। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ও ট্রলার রয়েছে ১২ হাজারটির মতো, যার মধ্যে ৬ থেকে ৭ হাজার ট্রলার নিয়মিত পদ্মায় মাছ শিকারে যায়। এসব নৌকার জন্য প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম।

শুক্রবার বিকেলে নড়িয়ার সুরেশ্বর এলাকায় পদ্মা পাড়ে আটকে থাকা নৌকাগুলো দেখে যায়। অধিকাংশ জেলেই জাল মেরামত, নৌকার গোছানো বা পাশাপাশি বসে ক্যারাম খেলায় মাতছেন। গড়িয়ারের চর ইউনিয়নের আবু সুফিয়ান বলেন, “তিন দিন ধরে জাল ফেলতে পারছি না। আগে ৭-৮ ঘণ্টা নদীতে কাটাতাম। এখন ২-৩ লিটার তেলে নদীর মাঝখানেই যাওয়া যায় না।”

চার দশকের জেলে চরমোহনের সিরাজুল ঢালী বলেন, “মাছ কম, তার ওপর তেলের সংকট। বাজারে যারা তেল দিচ্ছে, তারা লিটার প্রতি ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেশি নিচ্ছে।” তার বড় নৌকায় দৈনিক ১৫ লিটার তেল লাগলেও এখন তিনি পাচ্ছেন মাত্র ৫-৬ লিটার। “আগে ৭-৮ ঘণ্টা জাল ফেলতে পারতাম। এখন দুই-তিন ঘণ্টার বেশি থাকতে পারি না। এই অবস্থা চললে কীভাবে চলব?”—ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, ঈদের আগে মাছ ধরা সাধারণত কমে যায়, তবে এ বছর জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। “নৌকার সাইজ অনুযায়ী জেলেদের দৈনিক ৩ থেকে ১০ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। গত দুই-তিন দিন ধরে তারা খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তেল সংগ্রহ করতে পারছেন না। এর ফলে আগামী মাসগুলোতে মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।”

তবে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ডিজেল বিক্রিতে কোনো বিধিনিষেধ দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি জানান, “কোনো জেলে তেল পেতে সমস্যা হলে উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের মাধ্যমে পরিচয়পত্র দেখিয়ে সংগ্রহ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে সঠিক ব্যবহারের প্রমাণ দিতে হবে। আমরা কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে দেব না।”

0 comments on “তীব্র জ্বালানি তেলের সংকটে জেলেরা মাছ ধরতে পারছে না

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ