
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী সব ধরনের ক্ষতিকর জাল উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জসহ দেশের যেসব এলাকায় এসব কারেন্ট বা বেহুন্দি জাল তৈরি হয়, সেসব কারখানায় সরাসরি অভিযান চালানোর জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও মৎস্য কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
মৎস্য অধিদপ্তর আয়োজিত ‘জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫-২৬’-এর মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ নির্দেশ দেন। কর্মশালাটি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।
“উৎস মুখেই বন্ধ করতে হবে ক্ষতিকর জাল”
প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে জেলেদের ধরার পাশাপাশি জাল তৈরির মূল উৎস বন্ধ করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় আইনবহির্ভূত জাল তৈরির কারখানা রয়েছে। মাছ ধরা বন্ধের সময় নদীতে জেলেদের জাল ধরা হলেও নেপথ্যের কারখানাগুলো সচল থাকে। তাই এখন থেকে ক্ষতিকর জালের উৎপাদন ঠেকাতে সরাসরি কারখানাগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
জাটকা ইলিশ সংরক্ষণের সঙ্গে অনেকগুলো পক্ষ জড়িত থাকায়, কাজের সফলতার জন্য সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামার আহ্বান জানান তিনি।
৪০ লাখ মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ
মৎস্য খাতের বিশাল পরিধির কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রায় ৪০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য সেক্টরের ওপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন প্রজনন মৌসুমে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় যখন নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়, তখন জেলেদের জীবনযাত্র সচল রাখতে সরকার বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
তিনি জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে বিভিন্ন অঞ্চলে ১১টি আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে জেলেদের বিকল্প আয়ের নানামুখী প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কৃষি কার্ডের আওতায় আসছেন জেলেরা, আসছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’
জেলেদের জন্য বড় সুখবর দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের জেলেরা এখন থেকে সরকারের বিশেষ ‘কৃষি কার্ড’-এর আওতায় আসছেন। ইতোমধ্যে অনেক প্রকৃত জেলেকে এই কার্ড দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের সব নাগরিকের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পারিবারিক কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যা পর্যায়ক্রমে উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করা হবে। এর ফলে মৎস্য আহরণ বন্ধ থাকার দিনগুলোতে জেলেরা সহজেই খাদ্য ও আর্থিক সহায়তা পাবেন।
জিয়ার খাল খনন ও ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট
ইলিশের প্রাকৃতিক চলাচল বা মাইগ্রেটরি রুট সচল রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নদী ও খাল কাটার সঙ্গে মৎস্যসম্পদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই দূরদর্শিতা থেকেই শহীদ জিয়াউর রহমান দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও ইলিশের অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে নদী ও খালের নাব্য ফিরিয়ে আনার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি আরও যোগ করেন, মৎস্যসম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই এই খাতের টেকসই উন্নয়নে আরও বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে এবং দেশপ্রেমকে বুকে ধারণ করে সবাইকে সচেতন হতে হবে, তবেই মৎস্য খাতে সমৃদ্ধি আসবে।
কর্মশালার অন্যান্য আলোচকবৃন্দ
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ইলিশ ব্যবস্থাপনা) আবুল কালাম আজাদ। ড. মো. খালেদ কনকের সভাপতিত্বে কর্মশালায় অন্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন:
অনুরাধা ভদ্র, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট।
নীলুফা আক্তার, অতিরিক্ত সচিব (বাজেট), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
সৈয়দা নওয়ারা জাহান, অতিরিক্ত সচিব (মৎস্য অনুবিভাগ), মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

