জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মাটির লবণাক্ততা। ফলে স্বাভাবিক কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকায় তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই প্রতিকূল পরিবেশের কাছে হার না মেনে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কক্সবাজারের উপকূলজুড়ে এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে লবণসহিষ্ণু জাতের ধান চাষ।
কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, রামু, উখিয়া, টেকনাফ ও সদর উপজেলায় প্রায় ৩০ হাজার ৬৮০ হেক্টর লবণ উৎপাদনকারী জমি রয়েছে। আগে গ্রীষ্মকালে এসব মাঠে লবণ চাষের পর বর্ষায় বিশাল এলাকা অনাবাদি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর পর লবণসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন হওয়ায় পরিস্থিতি বদলে যেতে শুরু করে।
চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুম মিলে মোট ৫ হাজার ৮৯১ হেক্টর জমি লবণসহিষ্ণু ধান চাষের আওতায় এসেছে, যা গত অর্থবছরের (৫ হাজার ৮০২ হেক্টর) চেয়ে ৮৯ হেক্টর বেশি। কেবল চলতি খরিফ-২ মৌসুমে জেলার ৩ হাজার ৬০৭ হেক্টর লবণাক্ত জমিতে ধান চাষ হয়েছে—যা গত মৌসুমের চেয়ে ৫৫ হেক্টর বেশি।
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সোনালী ফসলের স্বপ্ন
অতীতে লবণ মাঠে প্রথমদিকে ‘ব্রি-৪৭’ জাতের ধান চাষ শুরু হলেও ফলন আশানুরূপ ছিল না। তবে বর্তমানে একাধিক উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদী জাত বাজারে আসায় প্রান্তিক কৃষকদের আস্থা বেড়েছে।
চলতি মৌসুমে উপকূলীয় লবণ মাঠে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে উফশী জাতের ব্রি ধান-৭৫। এছাড়া ব্রি ধান-৩৩, ব্রি ধান-৪৯, বিনা-৭ এবং স্থানীয় জাতের বিন্নি ও পাইজাম ধানের আবাদ হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, এসব স্বল্পমেয়াদী জাত মাত্র ১০০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। ফলে খুব অল্প সময়ে ফলন ঘরে তুলে কৃষকেরা যথাসময়ে পুনরায় লবণ উৎপাদনের জন্য মাঠ প্রস্তুত করতে পারছেন। এতে একই জমি থেকে বছরে দুটি ভিন্ন ফসল উৎপাদন করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন উপকূলীয় কৃষক পরিবারগুলো।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র ও কৃষকদের অভিজ্ঞতা
কক্সবাজার সদরের চৌফলদন্ডী এলাকার কৃষক শাহাজাহান বলেন, “আগে জানা ছিল না বলে লবণ চাষ শেষে জমি পরিত্যক্ত ফেলে রাখতাম। চার বছর আগে অল্প করে লবণসহিষ্ণু ধান চাষ শুরু করি। ভালো ফলন দেখে এখন আমাদের এলাকায় প্রায় অর্ধশত হেক্টর জমিতে এই ধানের আবাদ হচ্ছে।”
একই অনুভূতি প্রকাশ করেন টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপের কৃষক মোহাম্মদ হোসেন। তিনি জানান, লবণাক্ততার কারণে বর্ষায় স্বাভাবিক ফসল হতো না। এখন লবণসহিষ্ণু জাত আসার পর লবণ মৌসুমের বাইরে দু-থেকে তিনবার ধান চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না থাকলে চলতি মৌসুমে কানি (স্থানীয় পরিমাপ) প্রতি প্রায় ১০০ আরির বেশি ফলন পাবেন বলে আশা করছেন তিনি।
টেকনাফ উপজেলায় চলতি মৌসুমে ১১ হাজার ৭০ হেক্টর মোট ধান চাষের মধ্যে ২০২ হেক্টর লবণাক্ত জমিতে (হোয়াইক্যং, হ্নীলা, সদর, সাবরাং ও বাহারছড়া) ব্রি ধান-৭৫, ব্রি ধান-৩৩ ও বিনা-৭ সহ বিভিন্ন জাতের আবাদ করা হয়েছে।
প্রসার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতামত
হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী এবং চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনজুর আলম জানান, লবণ মৌসুমের পর পরিত্যক্ত জমিগুলোকে ধান চাষের আওতায় আনা গেলে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের কৃষি খাতও সমৃদ্ধ হবে। সাধারণ কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি বিভাগকে সব ধরনের সহায়তা করার আশ্বাস দেন তারা।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় বীজ ও সারের চড়া মূল্যের কারণে তারা সঠিক সময়ে আবাদ করতে হিমশিম খান। ইউনিয়ন বা মাঠ পর্যায়ে সরকারি প্রণোদনা, সহজলভ্য বীজ ও সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে জেলার প্রায় সব পরিত্যক্ত লবণ মাঠকে চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
কক্সবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) ড. বিমল কুমার প্রামাণিক জানান, “জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লবণাক্ত এলাকায় খাদ্যের সংস্থান নিশ্চিত করতে লবণসহিষ্ণু ধান আবাদে আমরা কৃষকদের নিবিড়ভাবে উদ্বুদ্ধ করছি। মাঠ পর্যায়ে উপজেলা কৃষি অফিসগুলোর তদারকি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে প্রতি বছরই চাষের আওতা বাড়ছে।”
তিনি আরও জানান, যেসব কৃষক লবণ মাঠে ধান চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, তাদের জন্য কৃষি প্রণোদনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় উচ্চমানের বীজ ও সার সরবরাহের কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে জেলাজুড়ে লবণসহিষ্ণু ধানের বাম্পার ফলন অর্জিত হবে।

