
চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩ কিলোমিটার চওড়া ‘সবুজচর’। বর্তমানে এই চরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন স্থানীয় কৃষকদের উৎসবমুখর ব্যস্ততা। বালতি আর বস্তায় করে অঙ্কুরিত বীজ নিয়ে জমিতে ছিটিয়ে যাচ্ছেন মাঠের পর মাঠজুড়ে। সন্দ্বীপের কৃষকদের কাছে বিশেষ এই চাষপদ্ধতির নাম ‘বাইন’ (ব্রডকাস্ট পদ্ধতি)। এই পদ্ধতিতে প্রথাগত উপায়ে আলাদাভাবে বীজতলা তৈরি করতে হয় না বলে কৃষকের উৎপাদন খরচ যেমন বাঁচে, তেমনি শ্রমও লাগে অনেক কম।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের অন্য সব এলাকায় সাধারণত বীজতলার মাধ্যমে চারা তৈরি করে রোপা আমন চাষ হলেও সন্দ্বীপে যুগ যুগ ধরে ‘বাইন’ পদ্ধতিতেই আমন বা শাইল ধানের চাষ হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে ধানবীজকে তিন দিন ধরে কয়েক দফায় পানিতে ডুবিয়ে ও শুকিয়ে শিকড় বের করা হয়। প্রতিটি ধানের মুখে সাদা অঙ্কুর বা শিকড় বেরিয়ে এলে নরম কাদামাটিতে তা ছিটিয়ে দেওয়া হয়।
দেশের বৃহত্তম একক আমন ভাণ্ডার এখন সবুজচর
উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, এবার ডোবাচরসহ সবুজচরের প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হচ্ছে, যা আয়তনের দিক থেকে বর্তমানে দেশের বৃহত্তম একক আমন ভাণ্ডার।
রাজাশাইল ও লেম্বু ধান: চরের প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে ছিটানো হচ্ছে স্থানীয় রাজাশাইল ও লেম্বু ধানের বীজ। সন্দ্বীপের উপকূলবর্তী নোনা জমিতে কয়েক শ বছর ধরে চাষ হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাজাশাইল ধান। পাশাপাশি ইদানীং অধিক ফলন ও জনপ্রিয়তার কারণে লেম্বু ধানের চাষও ব্যাপক হারে বাড়ছে।
অন্যান্য জাত: বাকি ১ হাজার হেক্টর জমিতে স্বর্ণ ইরি, বাংলা শাইল ও কাজল শাইলসহ আমনের কয়েকটি আধুনিক জাতের আবাদ করা হচ্ছে।
‘বাইন’ পদ্ধতিতে খরচ ও শ্রম কেন কম?
বর্ষার শুরুতে, বিশেষ করে আষাঢ়ের প্রথম ভাগে জমিতে পানি জমিয়ে রেখে ট্রাক্টর দিয়ে নরম কাদামাটিতে পরিণত করা হয়। এরপর ছিটিয়ে দেওয়া হয় অঙ্কুরিত ধানের বীজ (বাইন)। পানির নিচে নরম কাদায় দ্রুত শিকড় ছড়িয়ে পড়লে পানির ওপরে মাথা তোলে সরু ধানের চারা।
সবুজচরের থাক দীর্ঘাপাড় মৌজার চাষি সাদ্দাম হোসেন (৩২) বলেন:
“গোছা বুনে (রোপা পদ্ধতিতে) ধান চাষ করতে গেলে এই বিশাল চরে হাজার হাজার শ্রমিকের দরকার হতো, যা এই সময়ে পাওয়া অসম্ভব। খরচ বেড়ে গেলে আমাদের লাভ কমে যাবে। বাইন ছিটিয়ে চাষ করায় খরচ ও শ্রম দুটোই চার ভাগের এক ভাগে নেমে আসে।”
চাষিরা জানান, চারা গজিয়ে শক্তপোক্ত হওয়া পর্যন্ত এখন কেবল জমিতে পানি ধরে রাখা নিশ্চিত করলেই চলবে। তারপর সামান্য সার ছিটিয়ে দিলে আর বাড়তি কোনো শ্রম দিতে হবে না।
এক নজরে সন্দ্বীপের ‘বাইন’ চাষ পদ্ধতি:
| বিষয়ের নাম | বিস্তারিত তথ্য |
| মোট চাষের জমি | প্রায় ৫,০০০ হেক্টর (সবুজচর ও ডোবাচর)। |
| প্রধান জাতসমূহ | ঐতিহ্যবাহী রাজাশাইল, লেম্বু ধান, স্বর্ণ ইরি ও বাংলা শাইল। |
| পদ্ধতির মূল সুবিধা | আলাদা বীজতলা লাগে না, শ্রম ও উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ কম। |
| বিকল্প ব্যবহার | গবাদিপশুর জন্য কাঁচা খড় উৎপাদন ও একই সাথে ধান সংগ্রহ। |
গবাদিপশুর খাদ্য ও ধান: একই জমিতে দুই সুবিধা
সন্দ্বীপের পূর্ব উপকূল ঘেঁষে বেড়িবাঁধের ভেতরের জমিগুলোতে একসময় শুধু রোপা আমন হলেও এখন সেখানেও ‘বাইন’ পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। অনেকে আবার গবাদিপশুর কাঁচা খড়ের জোগান দিতে এই পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন।
চর সন্তোষপুরের চাষি তছলিম উদ্দিন (৫০) বলেন, “বর্ষাকালে চারদিকে পানি থাকায় গরু-মহিষ চরানোর জায়গার খুব সংকট হয়। খরচ কম হওয়ায় আমরা জমিতে বাইন ছিটিয়ে দিই। বড় হলে কয়েকবার করে ওপর থেকে ধানের কচি গোছা কেটে মহিষকে খাওয়াই, পরে সেই একই জমি থেকে ধানও ঘরে তুলতে পারি।”
কম খরচে লাভ হলেও রয়েছে প্রকৃতির ঝুঁকি
স্বল্প শ্রমে ধান বুনতে পারলেও উপকূলের তীব্র রোদ আর খরা নিয়ে চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। চরের খোলা প্রান্তরে টানা দু-তিন দিন প্রখর রোদ থাকলে কাদার পানি শুকিয়ে ধানবীজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। চাষি মাইন উদ্দিন (৪০) আক্ষেপ করে বলেন, “খরানে (খরায়) যদি বাইন মাটি না ধরে, তবে বড় লোকসানে পড়তে হবে। যে কড়া রোদ পড়ছে, আল্লাহ্ যেন দ্রুত বৃষ্টি দেন।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ ইসলাম জানান, সবুজচরের বিস্তীর্ণ মাঠে ব্রডকাস্ট বা বাইন পদ্ধতিতে আমন চাষ উপকূলীয় এলাকার জন্য একটি চমৎকার টেকসই প্রযুক্তি। তীব্র খরা বা অনাবৃষ্টির মুখে না পড়লে এই পদ্ধতি দারুণ কার্যকর। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সন্দ্বীপের আউশ চাষিরা জমিতে ক্ষুদ্র গর্ত করে শুকনা ধান মাটিচাপা দিয়ে যেভাবে চাষ করেন, তা সন্দ্বীপের বাইরে আর কোথাও দেখা যায় না।
ধানের বাম্পার উৎপাদন, ইলিশ মাছের জোগান আর বিপুল পশুপালনের কারণে সন্দ্বীপের সবুজচর এখন উপকূলীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক অনন্য উদাহরণ। চাষিদের প্রত্যাশা—প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা উচ্চ জোয়ারের বড় কোনো ধাক্কা না এলে আগামী কার্তিক মাসেই সোনালি ধানে ভরে উঠবে তাঁদের আঙিনা।

