
ভোরের আলো ফুটতেই রাঙামাটির বনরূপা বাজারে আনারসভর্তি প্রায় অর্ধশত নৌযানের ভিড়। ঘাটে নোঙর করা সেই সব নৌকা থেকে ঝুড়ি ভরে আনারস উঠছে সারিবদ্ধ পিকআপ ভ্যান আর ট্রাকে। পাইকারদের হাঁকডাক আর দরদামে মুখর চারপাশ। রাঙামাটির পাহাড়ের ঢালে ঢালে উৎপাদিত রসালো ও মিষ্টি আনারস এখন ট্রাকে করে পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ দেশের নানা প্রান্তে।
উৎপাদন ও সাফল্যের নতুন রেকর্ড
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাঙামাটিতে আনারসের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় আকাশচুম্বী।
এক নজরে উৎপাদনের পরিসংখ্যান:
| বিষয় | ২০২৪-২৫ অর্থবছর | ২০২৫-২৬ অর্থবছর | প্রবৃদ্ধির চিত্র |
| আবাদের জমি | ২,৫৩৭ হেক্টর | ২,৬৬০ হেক্টর | ১২৩ হেক্টর বৃদ্ধি |
| হেক্টর প্রতি ফলন | ২৫.৮৫ মেট্রিক টন | ৩৪ মেট্রিক টন | ৮.১৫ টন বৃদ্ধি |
| মোট উৎপাদন | ৬৫,৫৭৪ মেট্রিক টন | ৯০,৪৩৯ মেট্রিক টন | ২৪,৮৬৫ টন বৃদ্ধি |
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “এখানকার লাল মাটি ও পাহাড়ি ঢাল আনারস চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় চাষিরা ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।”
চাষিদের মুখে হাসির ঝিলিক
রাঙামাটির কুতুকছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল ও কাপ্তাই এলাকায় এখন শত শত আনারস বাগান। এসব বাগানে প্রধানত জনপ্রিয় ‘হানি কুইন’ জাতের আনারস চাষ হচ্ছে।
কুতুকছড়ির চাষি সুলক চাকমা জানান, গত বছর ১০ হাজার চারা লাগিয়ে দেড় লাখ টাকা আয় করেছিলেন। এবার ১৫ হাজার চারা লাগিয়েছেন এবং ২ লাখ টাকার বেশি লাভের আশা করছেন। বরকলের রনি দেওয়ান ২ একর জমিতে ২০ হাজার চারা লাগিয়েছেন। তিনি জানান, এবার বাজার দর ভালো হওয়ায় লাভের অংকও বাড়বে।
বদলানো ভাগ্যের গল্প: সুমিতা চাকমার সংগ্রাম
নানিয়ারচরের কলকপাড়া গ্রামের সুমিতা চাকমা জানান, আনারস চাষ করেই তাদের স্বামী-স্ত্রীর দিন বদল হয়েছে। ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ থেকে শুরু করে সংসারের সব ব্যয় মেটানো হয় এই বাগান থেকেই। নানিয়ারচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন মিয়া জানান, এক একর জমিতে খরচ বাদ দিয়ে বছরে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা লাভ করা সম্ভব।
বাজার পরিস্থিতি ও চাহিদা
রাঙামাটির আনারস মিষ্টি ও রসালো হওয়ার কারণে দেশজুড়ে এর বিপুল চাহিদা। বনরূপা বাজারে বড় একজোড়া আনারস ১২০ টাকা এবং মাঝারি সাইজের জোড়া ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ঢাকার পাইকার মো. করিম বলেন:
“রাঙামাটির আনারসের খ্যাতি চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কুমিল্লায় অনেক বেশি। আমরা সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে কিনে আড়তগুলোতে পাঠাই। এখানকার আনারস কখনো অবিক্রিত থাকে না।”
কেন রাঙামাটির আনারস সেরা?
১. প্রাকৃতিক স্বাদ: পাহাড়ি লাল মাটির কারণে কৃত্রিম সার ছাড়াই এটি মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়।
২. হানি কুইন জাত: এই জাতের আনারস ওজনে হালকা হলেও স্বাদে অত্যন্ত মিষ্টি।
৩. তাজা সরবরাহ: বাগান থেকে সরাসরি নৌপথে বাজারে আসায় এর সতেজতা বজায় থাকে।
রাঙামাটির এই সাফল্য পাহাড়ের প্রান্তিক জনপদে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনছে। কৃষিবিদদের মতে, যথাযথ হিমাগার ব্যবস্থা ও উন্নত যোগাযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই রসালো ফল বিদেশে রপ্তানি করেও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

