Thursday, 26 February, 2026

মাছ ও চিংড়ি চাষে ঘের বা পুকুর এ ব্লিচিং পাউডার


'ডিসইনফেক্ট্যান্ট' বা জীবাণুনাশক

মাছ ও চিংড়ি চাষে ঘের বা পুকুর প্রস্তুতিতে ব্লিচিং পাউডার একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি মূলত একটি শক্তিশালী জীবাণুনাশক, যা পানির পরিবেশকে নিরাপদ রাখতে জাদুর মতো কাজ করে।

ব্লিচিং কী?

মাছ ও চিংড়ি চাষে ব্লিচিং [Ca(ClO)2] বলতে সাধারণত ব্লিচিং পাউডার (ক্যালসিয়াম হাইপোক্লোরাইট) বা ক্লোরিনযুক্ত জীবাণুনাশক ব্যবহারকে বোঝানো হয়। এটি এক ধরনের শক্তিশালী অক্সিডাইজিং/ডিসইনফেকটিং কেমিক্যাল, যা পানির মধ্যে থাকা রোগজীবাণু, প্যারাসাইট, শৈবাল ও অপ্রয়োজনীয় ক্ষুদ্রজীব ধ্বংস করে। ব্লিচিং মূলত পুকুর বা ঘেরের পানি এবং মাটিকে জীবাণুমুক্ত বা কমবেশি রোগমুক্ত করতে ব্যবহৃত হয় (Faruk et al., 2010; Shamsuzzaman & Biswas, 2012)।

আরো পড়ুন
১২ লক্ষ ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফ: মন্ত্রিসভার বড় সিদ্ধান্ত

দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি দিতে বড় ধরনের স্বস্তির খবর দিয়েছে সরকার। সুদসহ ১০ হাজার টাকা Read more

ফল কি এখন ‘বিলাসদ্রব্য’? আমদানিকৃত ফলের বাজারে আগুন
ফল কি এখন ‘বিলাসদ্রব্য’?

গত চার বছরের তুলনায় বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং ডলারের বাজারও আগের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল। কিন্তু Read more

ব্লিচিং কী কাজে ব্যবহার করা হয়?

বাংলাদেশসহ অনেক দেশে মৎস্যচাষে ব্লিচিং পাউডারকে প্রচলিত অ্যাকুয়া-কেমিক্যাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটির ব্যবহার প্রধানতঃ (Faruk et al., 2010; Rahman et al., 2019; Shamsuzzaman & Biswas, 2012)- পুকুর বা ঘের প্রস্তুতকরণে (স্টকিংয়ের আগে পুরোনো রোগজীবাণু, অবশিষ্ট মাছ-চিংড়ির প্যাথোজেন কমাতে)

  • পানি জীবাণুমুক্ত করা ও ব্যাকটেরিয়া/ভাইরাস/ফাঙ্গাসের ঘনত্ব কমানো
  • কিছু পোকা-মাকড়, অপ্রয়োজনীয় ক্ষতিকর জীব (প্রিডেটর ফিশের ডিম, লার্ভা ইত্যাদি) নিয়ন্ত্রণ
  • ঘেরে রোগ দেখা দিলে আশপাশের পানি ও মাটি ডিসইনফেকশন

বাংলাদেশের মৎস্যখাতে ব্লিচিং পাউডারকে লাইম, ফরমালিন, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ইত্যাদির সঙ্গে সাধারণ “ডিসইনফেকট্যান্ট” গ্রুপে ধরা হয় (Faruk et al., 2010; Shamsuzzaman & Biswas, 2012; Rahman et al., 2019)।

ব্লিচিং কেন প্রয়োজন পুকুর/ঘেরে?

১. রোগ ঝুঁকি কমাতে
ঘন চাষে পানিতে প্রচুর জৈব বর্জ্য ও প্যাথোজেন জমে। রোগনিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কেমিক্যালের পাশাপাশি ব্লিচিং পাউডার বহুল ব্যবহৃত হয় (Faruk et al., 2010; Rahman et al., 2019; Shamsuzzaman & Biswas, 2012)। শ্রীম্প ঘেরে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে ৯০–৯৬% পর্যন্ত সুস্থতায় (রেকভারি) পাওয়া গেছে বলে মাঠসমীক্ষায় দেখা গেছে (Uddin et al., 2020)।

২. পানির মান উন্নত করতে
যথাযথ ডোজে ব্লিচিং দিলে পানির মাইক্রোবায়াল লোড কমে, ফলে মাছ/চিংড়ি তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ পায়, যদিও এটি সব সময় রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করতে পারে না (Tang et al., 2023; Uddin et al., 2020; Faruk et al., 2010)।

৩. চাষের আগে পুরোনো জীবাণু কমাতে
চক্র পরিবর্তনের সময় পুকুর শুকিয়ে মাটি চাষ, লাইম প্রয়োগের সঙ্গে অনেক জায়গায় ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে পুরোনো রোগের উৎস কমানোর চেষ্টা করা হয় (Shamsuzzaman & Biswas, 2012; Faruk et al., 2010)।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সামুদ্রিক ক্যানভাস পুকুরে ব্লিচিং পাউডার দিলে শুরুতে মাইক্রোবায়াল কমিউনিটি দ্রুত বদলেও ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই ৭৬% পর্যন্ত আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়, এবং ডিসইনফেকট্যান্ট-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া বাড়তেও পারে (Tang et al., 2023)। অর্থাৎ একবার ব্লিচিং দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি রোগনিয়ন্ত্রণ সবসময় হয় না; প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় দফা ডিসইনফেকশন বা বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করতে হয় (Tang et al., 2023)।

মাছ ও চিংড়ি চাষে ব্লিচিং ব্যবহারের সাধারণ নীতি

বাংলাদেশে করা সমীক্ষাগুলো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখায় (Faruk et al., 2010; Rahman et al., 2019; Shamsuzzaman & Biswas, 2012; Uddin et al., 2020; Sharma et al., 2020)—

  • ব্যবহারের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা
    • পুকুর/ঘের প্রস্তুতকরণে (স্টকিংয়ের আগে)
    • রোগ প্রাদুর্ভাবের পর ঘের ডিসইনফেকশন
  • সঠিক ডোজ ও পদ্ধতি জানা
    অনেক চাষি ডোজ, প্রয়োগপদ্ধতি ও “উইথড্রয়াল পিরিয়ড” (ঔষধ/কেমিক্যাল বন্ধ করে কত দিন পরে মাছ ধরা নিরাপদ) না জেনে ব্যবহার করেন—এটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে (Rahman et al., 2019; Faruk et al., 2010; Shamsuzzaman & Biswas, 2012)।
  • স্টকিং বা মাছ ছাড়ার আগে পর্যাপ্ত বিরতি
    ব্লিচিং দেওয়ার পর কিছু সময় (সাধারণত কয়েক দিন, স্থানীয় সুপারিশ অনুযায়ী) অপেক্ষা করতে হয়, যাতে ক্লোরিন ভেঙে যায় এবং পানিতে ক্ষতিকর অবশিষ্টাংশ না থাকে (Tang et al., 2023; Rahman et al., 2019)।
  • চলমান চাষে খুব সতর্ক ব্যবহার
    জীবন্ত মাছ/চিংড়ি থাকা অবস্থায় ব্লিচিং দিলে তাদের গিল, ত্বক ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে; তাই কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে, সুপারিশকৃত খুব কম ডোজে এবং অভিজ্ঞ পরামর্শে ব্যবহার উপযোগী।
  • পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনা
    ব্লিচিং সহ বিভিন্ন কেমিক্যাল ও অ্যান্টিবায়োটিকের অযথা, উচ্চ ডোজ বা ঘন ব্যবহার থেকে পরিবেশ দূষণ, অবশিষ্টাংশ এবং রেজিস্ট্যান্স (প্রতিরোধী জীবাণু) তৈরির ঝুঁকি থাকে (Tang et al., 2023; Simbo et al., 2025; Shamsuzzaman & Biswas, 2012; Faruk et al., 2010)। তাই বেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিস (BMP) ও প্রশিক্ষিত মৎস্য কর্মকর্তার নির্দেশনা মেনে চলা প্রয়োজন (Boyd, 2003; Sharma et al., 2020; Faruk et al., 2010)।

সংক্ষেপে ব্যবহারিক দিক (ধারণাগত গাইডলাইন, নির্দিষ্ট ডোজ নয়)

গবেষণা ও মাঠ সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয় যে ব্লিচিং পাউডারকে—

পুকুর শুকিয়ে/আংশিক শুকিয়ে, পানির উচ্চতা কমিয়ে, সমানভাবে ছিটিয়ে বা গুলে ছিটানো হয় (স্টকিংয়ের আগে) (Shamsuzzaman & Biswas, 2012; Faruk et al., 2010)- প্রয়োগের পরে ২–৩ দিন বা তার বেশি সময় রেখে ক্লোরিন ভেঙে যাওয়া নিশ্চিত করা হয়, তারপর পানির মান (pH, DO ইত্যাদি) ঠিক আছে কিনা দেখে মাছ/চিংড়ি ছাড়া হয় (Tang et al., 2023; Uddin et al., 2020)- প্রয়োজনে লাইম, জিওলাইট, প্রোবায়োটিক ইত্যাদি অন্যান্য কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়, যাতে সামগ্রিকভাবে পানি ও মাটির মান ভালো থাকে (Rahman et al., 2019; Uddin et al., 2020; Shamsuzzaman & Biswas, 2012)তবে নির্দিষ্ট ডোজ, সময়, পদ্ধতি ও নিরাপত্তা সীমা এলাকার ধরণ, পানির গভীরতা, প্রজাতি (মাছ না চিংড়ি), ঘনত্ব, মাটির অবস্থা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে এবং তা সব সময় স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা অভিজ্ঞ মৎস্য বিশেষজ্ঞের লিখিত গাইডলাইন অনুসারে ঠিক করা উচিত (Uddin et al., 2020; Boyd, 2003; Sharma et al., 2020; Faruk et al., 2010)।

References

Tang, Y., Zhang, H., Yan, J., Luo, N., Fu, X., Wu, X., Wu, J., Liu, C., & Zhang, D. (2023). Assessing the efficacy of bleaching powder in disinfecting marine water: Insights from the rapid recovery of microbiomes.. Water research, 241, 120136. https://doi.org/10.1016/j.watres.2023.120136

Rahman, M., Mondal, S., & Hossain, A. (2019). Agrochemicals used in freshwater aquaculture in Jhenaidah district, Bangladesh. Asian-Australasian Journal of Food Safety and Security. https://doi.org/10.3329/aajfss.v3i2.55931

Simbo, E., , Z., Fang, L., Morgan, S., Sumana, S., Maguru, M., Chakanga, M., Gondwe, H., Bundu, A., Qiu, L., Song, C., & Meng, S. (2025). Occurrence, Dominance, and Combined Use of Antibiotics in Aquaculture Ponds. Toxics, 13. https://doi.org/10.3390/toxics13100892

Uddin, A., Hassan, R., Halim, K., Aktar, M., Yeasmin, M., Rahman, H., Ahmad, M., & Ahmed, G. (2020). Effects of aqua drugs and chemicals on the farmed shrimp (Penaeus monodon) in southern coastal region of Bangladesh. Asian Journal of Medical and Biological Research, 6, 491-498. https://doi.org/10.3329/ajmbr.v6i3.49798

Boyd, C. (2003). Guidelines for aquaculture effluent management at the farm-level. Aquaculture, 226, 101-112. https://doi.org/10.1016/s0044-8486(03)00471-x

Sharma, P., Kumar, J., Raman, G., Kumar, V., Anand, S., Bl, C., & Pandey, G. (2020). A case study on therapeutic use of chemicals and antibiotics in aquaculture practices in selected places of Kerala and Tamil Nadu states of India. Journal of entomology and zoology studies, 8, 844-851.

Shamsuzzaman, M., & Biswas, T. (2012). Aqua chemicals in shrimp farm: A study from south-west coast of Bangladesh. The Egyptian Journal of Aquatic Research, 38, 275-285. https://doi.org/10.1016/j.ejar.2012.12.008

Faruk, M., Ali, M., & Patwary, Z. (2010). Evaluation of the status of use of chemicals and antibiotics in freshwater aquaculture activities with special emphasis to fish health management. Journal of The Bangladesh Agricultural University, 6, 381-390. https://doi.org/10.3329/jbau.v6i2.4838

0 comments on “মাছ ও চিংড়ি চাষে ঘের বা পুকুর এ ব্লিচিং পাউডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ