Sunday, 08 November, 2026

বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই জামালপুরের কাঁচামরিচ চাষিদের


বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই জামালপুরের কাঁচামরিচ চাষিদের

আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং চরাঞ্চলে আগাম চাষের সুযোগ পাওয়ায় চলতি মৌসুমে জামালপুরে কাঁচামরিচের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে এই বাম্পার ফলন কৃষকদের জীবনে আনন্দের পরিবর্তে ডেকে এনেছে চরম আর্থিক হতাশা। ভরা মৌসুমে কাঁচামরিচের তীব্র দরপতনের কারণে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না স্থানীয় চাষিরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাদারগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উৎপাদিত পচনশীল এই কৃষিপণ্য পানির দামে পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা।

কেজিপ্রতি লোকসান ৫ থেকে ৬ টাকা

আরো পড়ুন
বাসায় ঘোড়া (Horse) পালন ও যত্ন: শখ থেকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা
বাসায় ঘোড়া পালন ও যত্ন: শখ থেকে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ

শোভাবর্ধন, শখ কিংবা রাইডিংয়ের উদ্দেশ্যে বিশ্বজুড়ে ঘোড়া পালনের চল বহু প্রাচীন। আমাদের দেশেও আজকাল অনেকে শখের বশে বা বাণিজ্যিকভাবে বাসায় Read more

শীতকালীন পোষা প্রাণীর (Pet Animals) যত্ন: প্রয়োজনীয় করণীয় ও সতর্কতা
শীতকালে কুকুর, বিড়াল বা পাখির বিশেষ যত্ন এবং কিছু জরুরি সতর্কতা আলোচনা

শীতের আগমন আমাদের জন্য আরামদায়ক হলেও, বাড়ির আদুরে পোষা প্রাণীগুলোর জন্য এই সময়টি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। অবোলা এসব প্রাণীরা নিজেদের কষ্টের Read more

জামালপুরে প্রতি কেজি কাঁচামরিচ উৎপাদন ও পরিচর্যায় খরচ হয় অন্তত ১২ টাকা। এর সাথে ফসল তোলার শ্রমিকের মজুরি যোগ হয় আরও ১০ টাকা। ফলে প্রতি কেজির মোট উৎপাদন খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ২২ টাকায়।

অথচ চরম ভরা মৌসুমে পাইকারি বাজারে কৃষকেরা প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র ১৬ থেকে ১৭ টাকায়। ফলে প্রতি কেজি কাঁচামরিচে চাষিদের সরাসরি ৫ থেকে ৬ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। বিপরীতে স্থানীয় খুচরা বাজারে একই কাঁচামরিচ ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।

মাদারগঞ্জ উপজেলার বালিজুড়ি ইউনিয়নের চর শুভাগাছা গ্রামের কৃষক ক্যাবল জানান, সার, কীটনাশক ও সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় এ বছর প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমান বাজারে যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মূলধন ওঠানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

একই গ্রামের কৃষক রশিদ মিয়া জানান, গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) মাদারগঞ্জের সর্ববৃহৎ কাঁচামরিচের হাট ‘গাবেরগ্রাম হাটে’ প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১৬ টাকা (মনপ্রতি ৬৪০ টাকা) দরে। অথচ মৌসুমের শুরুতে দাম ভালো ছিল।

আগাম চাষ ও অতিরিক্ত সরবরাহে দরপতন

সরিষাবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনুপ সিংহ এগ্রোবিডি২৪.কম-কে জানান, এ বছর বন্যা না থাকায় নিচু এলাকার কৃষকেরা স্বাভাবিক সময়ের আগেই মরিচ চাষ শুরু করতে পেরেছিলেন। ফলে উৎপাদনে সাফল্য আসলেও বাজারে একযোগে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষক পর্যায়ে দাম দ্রুত কমে গেছে।

গত বছরের বাজার দর তুলে ধরে তিনি বলেন, গত মৌসুমে চার মাসের মরিচ সিজনে শুরুতে প্রতি মণ বিক্রি হয়েছিল ৪,৫০০ টাকায়। এক মাস পর তা কমে ৩,০০০-৩,৫০০ টাকা এবং মৌসুমের শেষ দিকে ৭০০ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু এবার শুরুতেই পরিবর্তন দেখা গেছে—মৌসুমের শুরুতে পাইকারিতে প্রতি মণ ৪,৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এক মাসের মাথায় তা নেমে এসেছে মাত্র ৬৪০ টাকায়।

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার কৃষক হায়দার আলী আক্ষেপ করে বলেন, “সার, কীটনাশক আর জমি নিড়ানির পেছনে এত টাকা ঢাললাম, এখন বাজারে মরিচের কোনো দামই নেই। সংসার চালাব কীভাবে?”

আধুনিক ‘প্লাস্টিক মালচিং’ পদ্ধতিতে উচ্চফলনশীল ময়নামতি জাতের মরিচ চাষ করা জোরখালী ইউনিয়নের কৃষক আবদুল খালেক বলেন, জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজ, সার, সেচ ও পরিবহন খরচের পাশাপাশি এবার সার সংগ্রহেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ ও ব্যবসায়ীদের অস্বীকার

পাইকারি বাজারে কীভাবে দাম নির্ধারিত হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। সরিষাবাড়ী উপজেলার আদ্রা চরের কৃষক সোলেইমান কবির অভিযোগ করেন, পাইকার ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে সিন্ডিকেট করে আগে থেকেই কাঁচামরিচের দাম নির্ধারণ করে রাখেন। তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে কেউ মরিচ কেনে না।

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চুনিয়াপাটাল বাজারের ব্যবসায়ী মহিম বেপারী। তিনি দাবি করেন, বাজারে কোনো সিন্ডিকেট নেই। কৃষকেরা দাম পছন্দ হলেই পণ্য বিক্রি করেন এবং জেলাজুড়ে দর প্রায় একই রকম থাকে।

জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য

জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান জানান, চলতি বছর জেলায় কাঁচামরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬,৬৩৫ হেক্টর, যা অতিক্রম করে চাষ হয়েছে ৬,৬৫০ হেক্টরে।

শুধুমাত্র মাদারগঞ্জ উপজেলায় ৭৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১,০৫০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ হেক্টরে আগাম চাষ এবং ২৫ হেক্টরে প্লাস্টিক মালচিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। কৃষকেরা ময়নামতি, গ্রিন সুপার, নাগা ফায়ার, বিজলী, গ্রিন স্টার, সুপার ও প্রিমিয়ামের মতো উচ্চফলনশীল জাতের মরিচ আবাদ করেছেন।

মাদারগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান জানান, এ বছর উপজেলায় মরিচের মোট উৎপাদন ৪২,০০০ টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার কাঁচামরিচ ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া জামালপুরের কাঁচামরিচ মালয়েশিয়াতেও রপ্তানি করা হচ্ছে। নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খোঁজার প্রক্রিয়াও অব্যাহত রয়েছে। তিনি জানান, উপজেলার ২০০ জনের বেশি কৃষককে প্রণোদনা, কারিগরি পরামর্শ ও মালচিং সহায় দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সিন্ডিকেটের অসাধু তৎপরতা থেকে কৃষকদের বাঁচাতে এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুফ আলী।

0 comments on “বাম্পার ফলনেও মুখে হাসি নেই জামালপুরের কাঁচামরিচ চাষিদের”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ