Saturday, 31 October, 2026

পানিকচুর (লতিরাজ) লাভজনক চাষ পদ্ধতি


কচু শাকে প্রচুর পরিমাণে “ভিটামিন এ” থাকায় রাতকানা রোগ প্রতিরোধে এটি অত্যন্ত উপকারী। কচু আঁশ জাতীয় হওয়ায় এটি কোষ্ঠ-কাঠিন্য দূর করে। কচুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ও ক্যালসিয়াম যা আমাদের হাড় শক্ত করতে সহায়তা করে। ভিটামিন ই: ২০% ২.৯৩ মিগ্রা ভিটামিন ডি: ৮% ১.২ μg ভিটামিন বি৬: ২৫% ০.৩৩১ মিগ্রা খাদ্য আঁশ: ৫.১ g

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে পানিকচুর চাষ হচ্ছে, এ থেকে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টন লতি পাওয়া যায়। দিন দিন লতির চাহিদা বেড়েই চলছে।

বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পানি কচুর (লতিরাজ কচু) চাষ পদ্ধতি জেনে লতিরাজ কচুর ফলন বাড়ায়ে চাহিদা পুরণ করা সম্ভব।

আরো পড়ুন
স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: কম খরচে লাভজনক আনারকলি (Passion Fruit) চাষ পদ্ধতি ও যত্ন
বাংলাদেশে আনারকলি চাষ

বাংলাদেশের কৃষিতে সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রচলিত ফল ও সবজি চাষে বিপ্লব ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক নাম হলো Read more

লেয়ার মুরগি পালনঃ লেয়ার মুরগির ফার্মে কখন কি টিকা দিতে হবে?
লেয়ার মুরগির ফার্মে কখন কি টিকা দিতে হবে?

লেয়ার মুরগির খামারে রোগের ঝুঁকি দূর করতে এবং সঠিক ডিম উৎপাদন নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বয়স অনুযায়ী টিকা (Vaccine) দেওয়া আবশ্যক। Read more

বাংলাদেশ প্রাপ্ত কচুর জাত কি ?

খাবার উপযোগী জাতগুলোর অন্যতম হচ্ছে মুখীকচু, পানিকচু, পঞ্চমুখী কচু, পাইদনাইল, ওলকচু, দুধকচু, মানকচু, শোলাকচু ইত্যাদি।

বর্তমানে বাংলাদেশে লতিকচুর অনেক জাত থাকলেও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে নতুন জাত অবমুক্ত করা হয়েছে লতিরাজ কচু, এ লতি চাষ বেশ লাভজনক।

লতিরাজ কচুর বৈশিষ্ট

লতিরাজ কচুর লতি সবুজ, সামান্য চেপ্টা,ও লম্বায় ৯০-১০০ সেমি. হয়।

এ কচুর পাতার সংযোগস্থলের ও বোঁটার রং বেগুনি। লতিরাজ কচুর জীবনকাল ১৮০-২১০ দিন। লতিরাজ কচু আমাদের দেশের সব অঞ্চলেই চাষ করা যায়।

কচু চাষের জমি ও মাটি তৈরি

পলি দো-আঁশ ও এটেল দো-আঁশ জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি লতিরাজ কচু চাষের জন্য উপযুক্ত। বেলে মাটি রস ধরে রাখতে পারে না তাই এ ধরনের মাটি লতি চাষের জন্য ভালো নয়। উঁচু থেকে মাঝারি নিচু যেকোন জমি। বৃষ্টির পানি জমেনা এবং প্রয়োজনে সহজেই পানি ধরে রাখা যায় এমন জমি।

পানিকচু থেকে কচুর লতি পাওয়া যায়। লতি উৎপাদনের জন্য পানিকচুর জমি ভেজা ও শুকনো উভয় ভাবেই প্রস্তুত করা যায়। ভেজা জমি তৈরি করার নিয়ম হলো-ধান রোপণের জমি যেভাবে তৈরি করা হয়ে থাকে সে ভাবে তৈরি করতে হয়।

শুকনোভাবে জমি তৈরির জন্য চার থেকে পাঁচটি আড়াআড়িভাবে চাষ ও মই দিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হয়।

লতি রোপণ সময়

আগাম লতি রোপনের জন্য কার্তিক( মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) লাগাতে হয়। আর নাবী ফসলে জন্য মধ্যফালগুন থেকে মধ্য বৈশাখ (মার্চ- এপ্রিল) মাসে লাগানো যায়।

পানিকচুর বংশবিস্তার

একটি পূর্ণবয়স্ক পানিকচুর গোড়া থেকে যে সকল ছোট ছোট চারা হয়ে থাকে সেগুলোকেই বীজ হিসেবে জমিতে লাগানে হয়।

কচুর লতি চাষ

লতিরাজ কচুর চারা রোপণ পদ্ধতি

পানি কচুর চারার বয়স কম হতে হয়। চারা চার থেকে ছয় পাতার হলে সবল ও সতেজ গুলো রোপণের জন্য নির্বাচন করতে হয়। জমিতে চারা রোপণের সময় উপরের দিকের দুই থেকে তিনটি পাতা রোখে বাকি পাতা গুলো ছাঁটাই করে দিতে হবে।

কোন চারা যদি গোড়ার দিকে বেশি লম্বা হয় তাহলে কিছু শিকড়সহ গোড়ার অংশবিশেষ ছাঁটাই করে দিতে হয়। কচুর সারি থেকে সারির দুরত্ব হবে ৬০ সেমি. এবং গাছ থেকে গাছ ৪৫ সেমি. দুরত্বে চারা রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের জন্য মাটির গভিরতা হবে ৫-৬ সেমি।

কচুর জমিতে পরিচর্যা

মুল জমিতে চারা রোপন করতে দেরি হলে পানিকচুর চারা ভেজা মাটি ও ছায়া যুক্ত স্থানে রেখেদিতেম হবে। জমিতে চারা রোপণের সময় চারা যাতে হেলে না পড়ে সে জন্য মাটি কাদা করার সময় বেশি নরম করা যাবেনা।

গাছ কিছুটা বড় হলে গোড়ার হলুদ পাতা বা শুকিয়ে যাওয়া পাতা ছাঁটাই করে দিতে হবে। ক্ষেতে কোন প্রকার আগাছা জন্মাতে দেওয়া যাবেনা সব সময় পরিস্কার রাখতে হবে।

পানি কচুর গাছে লতি আসার সময় ক্ষেতে পানি জমতে দেওয়া যাবেনা।আবার একেবার শুকনো রাখা যাবেনা শুকনো রাখলে লতি কম বের হয় বা দৈঘ্য কম হয়।

জমিতে সার প্রয়োগ

লতিরাজ কচুর ফলন বাড়ানোর জন্য প্রতি শতকে এমওপি ৭৫০ গ্রাম, ইউরিয়া ৬০০গ্রাম, টিএসপি ৫০০গ্রাম, গোবর ৫০কেজি করে দিয়ে জমি তৈরির শেষ চাষের সময় ছিটিয়ে মাটির সাথে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

ইউরিয়া সার ২-৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম কিস্তির সার চারা রোপণের ২০-২৫ দিনের মধ্যে প্রয়োগ করা ভালো।
সার প্রয়োগের পর হালকা সেচ দিতে হবে। জমিতে কোন সময় দস্তা ও জিংকের অভাব থাকলে জিপসাম ও জিংক সালফেট সার ব্যবহার করতে হবে। জয়পুরহাট অঞ্চলের চাষিরা প্রতিবার লতি সংগ্রহের পর ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করে থাকেন।

পানি সেচ ও নিস্কাশন

কচু একটি জলজ উদ্ভিদ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। বিষেশ করে লতি উৎপাদনের সময় জমিতে পানি ধরে রাখা উচিত নয়। জমিতে জো থাকলে লতি বেশি বের হয়।

কচুর রোগ ও ব্যবস্থাপনা

কচুর সাধারনত কোন রোগ দেখা যায় না রোগের মধ্যে কচুর পাতার মড়ক রোগ হয়ে থাকে। পাতার উপরে বাদামি থেকে বেগুনি রংয়ের গোলাকার দাগ দেখা যায়।

পরবর্তীতে এ সমস্ত দাগ আকারে বড় হয়ে একত্রিত হয়ে যায় এবং পাতা ঝলসে যায়। পরে এ দাগ কচু ও কন্দে বিস্তার লাভ করে।

পরপর ৩-৪ দিন বৃষ্টি থাকলে ও উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্ আবহাওয়ায় এ রোগের মাত্রা বেড়ে থাকে।

রোগ দেখা দেওয়ার সাথে সাথে প্রতি লিটার পানিতে, ডাইথেন এম ৪৫ অথবা ২ গ্রাম রিডোমিল এম জেড-৭২ মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর ৩-৪ বার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োগের আগে ট্রিকস মিশিয়ে নিতে হয়।

ফসল সংগ্রহ

লতি রোপণের ২ মাস পর থেকে ৭ মাস বয়স পর্যন্ত লতি সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

অনেক জেলাতেই লতিরাজ কচু চাষ করে বেকার সমস্যার সমাধান ও ভাগ্য পরিবর্তন করেছে ।

0 comments on “পানিকচুর (লতিরাজ) লাভজনক চাষ পদ্ধতি”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ