দেশী মুরগী পালন ও চিকিৎসা কিভাবে করব? দেশী মুরগী পালন ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে জানতে চাই।
আপনি জানতে চেয়েছেন দেশি মুরগী পালন ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে। দেশি মুরগী পালন ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে প্রাইমারি আলোচনা করব।
গ্রামের বাড়িতে দেশি মুরগি এমনিতে প্রতি বাড়ীতে ৫-১০ হয়ে যায়। এভাবে ব্যবসায়িক চিন্তা করা যাবে না। দেশি মুরগির পালন লাভজনক করতে হলে কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার, সে জাত নির্বাচনেই হোক বা রোগ পরিচর্যায়।

দেশি মুরগির জাত নির্বাচন মুরগি চাষের চিন্তা করতে হবে। যেমন, রোড আইল্যান্ড রেড (আরআইআর) বা ব্ল্যাক অস্ট্রালর্প। ইদানীং বনরাজা, গিরিরাজা, গ্রামরপ্রিয়া ইত্যাদি জাত কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং পরে মুরগি রাতে থাকার জন্য ঘর নির্মান করতে হবে।
মুরগির বাসস্থানঃ
প্রতিটি মুরগির জন্য গড়ে তিন বর্গফুট জায়গা ধরে মাটি থেকে সামান্য উপরে বাঁশ বা কাঠ দিয়ে কম খরচে খড় বা টালি ঢেকে তৈরি ঘরগুলো যেন শুকনো, পরিষ্কার হয়। মুরগি ঘরে আলো-বাতাস থাকা ভাল।
দেশি মুরগির সুষম খাবার;
দেশি মুরগি খাবার কুড়িয়ে খেতে পছন্দ করে। এদের খাবার বাসায় তৈরি সুষম খাবার হওয়া উচিত। চালের গুঁড়ো (৩০০ গ্রাম), খুদ বা গম ভাঙা (২৮০ গ্রাম), সর্ষে/ তিল খোল ( ২০০ গ্রাম), মাছ বা সোয়াবিন গুঁড়ো (২০০ গ্রাম), ভিটামিন ও খনিজ লবণ মিশ্রণ যেমন সাপ্লিভিট এম (২০ গ্রাম) মিশিয়ে মুরগির সংখ্যা অনুযায়ী মাথা পিছু ৫০-৭০ গ্রাম হিসাবে
অর্ধেক সকালে ও অর্ধেক বিকালে খেতে দিতে হবে।
রাতের বেলা মুরগির ঘরে পানির ব্যবস্থা করতে হবে।
মুরগির রোগ বালাইঃ
দেশি মুরগিতে রাণীক্ষেত রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যায়। এ রোগ হলে মুরগী খাওয়া বন্ধ করে দেয়।মাথা নিচু ও চোখ বন্ধ করে ঝিমাতে থাকে। সাদা চুনের মত পাতলা মল ত্যাগ করে।নাক দিয়ে সর্দি ও মুখ দিয়ে লালা ঝরে।

রাণীক্ষেত রোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসাঃ
রাণীক্ষেত রোগের এক মাত্র সমাধান টীকা ব্যবহার করা। এ ছাড়া দ্বিতীয় বার রোগের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যেতে পারে
বাংলাদেশ আবহাওয়া ও জলবায়ু মুরগী পালনের জন্য বেশ উপযোগী এদেশের মুরগি পালনের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে সাধারণত ডিম ও মাংস উৎপাদনের জন্য মুরগির পালন করা হয়ে থাকে
দেশি মুরগির খামারের চাহিদা বাংলাদেশে সবসময়ই তুঙ্গে। কারণ, সাধারণ মানুষ ব্রয়লার বা লেয়ারের চেয়ে দেশি মুরগির স্বাদ ও পুষ্টিগুণকে বেশি গুরুত্ব দেয়। একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি প্রকল্প হতে পারে।
নিচে একটি পূর্ণাঙ্গ দেশি মুরগি খামার পরিকল্পনা তুলে ধরা হলো:
১. খামারের ধরন নির্বাচন
শুরুতেই ঠিক করতে হবে আপনি কোন পদ্ধতিতে মুরগি পালন করবেন:
সম্পূর্ণ মুক্ত পদ্ধতি: মুরগি সারাদিন বাইরে চড়ে বেড়াবে। খরচ কম, কিন্তু উৎপাদনও কম।
অর্ধ-আবদ্ধ পদ্ধতি (সেরা উপায়): মুরগির জন্য একটি ঘর থাকবে এবং সামনে ঘেরা দেওয়া খালি জায়গা থাকবে। এতে মুরগি প্রাকৃতিক খাবারও পাবে আবার নিরাপদও থাকবে।
২. বাসস্থান বা ঘর নির্মাণ
স্থান: উঁচুজায়গা বেছে নিন যেখানে পানি জমে না এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে।
জায়গার পরিমাণ: বড় মুরগির জন্য প্রতিটিতে গড়ে ১.৫ থেকে ২ বর্গফুট জায়গা লাগে।
ঘরের ধরন: পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বি ঘর বানাতে হবে যাতে সরাসরি রোদ ভেতরে না ঢোকে কিন্তু আলো থাকে। মেঝে পাকা হলে ভালো, তবে কাঁচা হলে বালু ও তুষ ব্যবহার করতে হবে।
৩. জাত ও বাচ্চা সংগ্রহ
দেশি মুরগির মধ্যে সাধারণ দেশি ছাড়াও হিলী, আসিল বা নগ্ন গলা (Naked Neck) জাত জনপ্রিয়।
সবচেয়ে ভালো হয় যদি বিশ্বস্ত কোনো খামারি বা সরকারি হ্যাচারি থেকে ১ দিনের বাচ্চা সংগ্রহ করেন।
শুরুতে ১০০-২০০টি বাচ্চা নিয়ে ছোট পরিসরে শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. খাদ্য ব্যবস্থাপনা
দেশি মুরগির প্রধান সুবিধা হলো এরা যা পায় তাই খায়। তবে বাণিজ্যিক লাভের জন্য সুষম খাবার প্রয়োজন:
প্রাকৃতিক খাবার: চালের কুঁড়া, গমের ভূষি, খুদ, সরিষার খৈল এবং শাকসবজি।
রেডি ফিড: দ্রুত বৃদ্ধির জন্য স্টার্টার ফিড দেওয়া যেতে পারে।
মুক্ত চারণ: দিনে কয়েক ঘণ্টা বাইরে ছাড়লে তারা পোকা-মাকড় ও ঘাস খেয়ে প্রোটিনের চাহিদা মেটায়।
৫. রোগ প্রতিরোধ ও টিকা (ভ্যাকসিন)
দেশি মুরগির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হলেও ভাইরাসের আক্রমণে খামার খালি হয়ে যেতে পারে। তাই একটি ভ্যাকসিন চার্ট মেনে চলতে হবে:
রানিখেত (BCRDV): বাচ্চার বয়স ৩-৫ দিন এবং ২১ দিনে।
গামবোরো: বাচ্চার বয়স ১০-১২ দিন এবং ১৮-২০ দিনে।
বসন্ত (Pox): ৩৫-৪০ দিনে।
প্রাথমিক বিনিয়োগ ও লাভ-ক্ষতির একটি নমুনা (১০০ মুরগির জন্য)
| আইটেম | বিবরণ | আনুমানিক খরচ (টাকা) |
| বাচ্চা ক্রয় | ১০০টি (৫০-৬০ টাকা দরে) | ৫,০০০ – ৬,০০০ |
| ঘর তৈরি | বাঁশ, নেট ও টিন দিয়ে অস্থায়ী | ৫,০০০ – ৭,০০০ |
| খাবার খরচ | ৪ মাস পর্যন্ত (প্রতিটি ৩ কেজি ফিড) | ১৫,০০০ – ১৮,০০০ |
| ওষুধ ও ভ্যাকসিন | আনুমানিক | ১,০০০ – ১,৫০০ |
| মোট খরচ | ২৬,০০০ – ৩২,০০০ |
সম্ভাব্য আয়: ৪-৫ মাস পর প্রতিটি মুরগির ওজন গড়ে ৮০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি হলে এবং ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলে মোট আয় হবে প্রায় ৪০,০০০ – ৪৫,০০০ টাকা। (বাকি মুরগি ডিমের জন্য রাখলে আয় আরও বাড়বে)।
একজন নতুন উদ্যোক্তার জন্য ৩টি বিশেষ পরামর্শ:
একবারে বড় ঝুঁকি নেবেন না: প্রথমে ৫০-১০০টি মুরগি দিয়ে শুরু করে অভিজ্ঞতা অর্জন করুন।
বায়োসিকিউরিটি: খামারে বাইরের মানুষ বা অন্য প্রাণী ঢোকা বন্ধ রাখুন। ঢোকার মুখে পটাশ পানির স্প্রে রাখুন।
বাজারজাতকরণ: স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন বা পরিচিত মহলে “অর্গানিক” বা “সম্পূর্ণ দেশি” হিসেবে ব্র্যান্ডিং করুন।

