
যুদ্ধজনিত অস্থিরতার কারণে হরমুজ প্রণালীপথে সার সরবরাহকারী ১৭টি প্রতিষ্ঠান সময়মতো পণ্য দিতে পারবে কি না—এ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিক) আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সার কিনতে চায় সরকারি এই সংস্থা।
বিসিকের চেয়ারম্যান মো. ফজলুর রহমান জানান, জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহে বৈশ্বিক সংকটের কারণে দেশের কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের আওতা বাড়ানো হয়েছে।
“সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার জটিলতা সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গেও বিকল্প উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্রুনেই, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে,” বলেন তিনি।
চেয়ারম্যান জানান, জুন মাস পর্যন্ত সারের কোনো সংকট না থাকলেও জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ের জন্য প্রায় ৬ লাখ টন ইউরিয়া মজুত রাখা প্রয়োজন। গ্যাস সংকটের কারণে দেশীয় উৎপাদন দিয়ে এই চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এছাড়া বর্তমানে চীন সার রপ্তানি বন্ধ রেখেছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ওই দেশ থেকে সার আমদানির সুযোগ তৈরি করা যায় কি না—সে বিষয়টিও যাচাই করছে সরকার।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সারবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে চলাচল করতে পারে—তা নিশ্চিত করতে ২৯ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইরানে চিঠি পাঠানো হয়েছে। একই দিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক সভায় অতিরিক্ত ২ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানিতে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ফজলুর রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসি খুব শিগগির উৎপাদনে ফিরবে। কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ও শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড মে মাসের মধ্যে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সাল ইমাম জানান, দেশে চলতি বছর জুন মাস পর্যন্ত ইউরিয়া সারের মজুত রয়েছে। অন্যদিকে অ-ইউরিয়া সারের মজুত অক্টোবর পর্যন্ত যথেষ্ট থাকবে।
বাংলাদেশে বার্ষিক ইউরিয়া সারের চাহিদা সাড়ে ২৬ লাখ টনের বেশি। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত হয় প্রায় ১০ লাখ টন। বাকি চাহিদা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে আমদানি করতে হয়—যেসব দেশ হরমুজ প্রণালী দিয়েই সার, গ্যাস ও তেল পরিবহন করে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ধান উৎপাদন ছিল প্রায় ৪ কোটি টন, যার ৪০ শতাংশই আমন মৌসুমে হয়। আমন চাষ শুরু হয় জুনের পর।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার গবেষণা কর্মকর্তা আজাজুল হক জানান, অ-ইউরিয়া সার রাশিয়া, কানাডা, মরক্কো, চীন, তিউনিসিয়া, জর্ডান ও মিশর থেকে আমদানি করা হয়। ইউরিয়া মূলত সৌদি আরব ও কাতার থেকে আসে।
বর্তমানে সারের মজুতের পরিমাণ:
ইউরিয়া ৩ লাখ ৭৩ হাজার ১০০ টন, টিএসপি ৩ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টন, ডিএপি ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টন এবং এমওপি ৩ লাখ ১৮ হাজার ২০০ টন।
আমদানি রুট প্রসঙ্গে আজাজুল হক বলেন, অধিকাংশ সময় হরমুজ পথ ব্যবহার করা হয়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসা পণ্যের ক্ষেত্রে। তবে রাশিয়া, কানাডা ও চীন থেকে আসা পণ্যসম্ভার এই পথে পরিবহিত হয় না।
সম্প্রতি সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাইট্রোজেন সারের বেলওয়েদার হিসেবে বিবেচিত মিশরের গ্র্যানুলার ইউরিয়ার এফওবি (জাহাজিকরণমূল্য) যুদ্ধ শুরুর আগে ৪০০ থেকে ৪৯০ ডলার প্রতি মেট্রিক টন থাকলেও সম্প্রতি তা বেড়ে ৭০০ ডলারে পৌঁছেছে।
সারের চাহিদার শীর্ষ মৌসুম নভেম্বর থেকে মার্চ—এ সময় বোরো ধান চাষে দেশের মোট সারের ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা হয়।
ইউরিয়া ছাড়াও ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) ও ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) সার আমদানিতে মিশরের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার।

