
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’ বর্তমানে চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যশস্য আমদানি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক জাহাজ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ এড়িয়ে চলায় পুরো অঞ্চলে খাদ্যঘাটতি ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
আমদানি নির্ভরতায় বড় ধাক্কা
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমস’ (এফটি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর উপসাগরীয় দেশগুলো প্রায় ৩ কোটি টন খাদ্যশস্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে এককভাবে ইরানের হিস্যা ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ টন। কমোডিটি অ্যানালিটিকস কোম্পানি ‘কেপলার’-এর তথ্যমতে, এই শস্যের সিংহভাগই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
কেপলারের বিশ্লেষক ঈশান ভানু জানান, “পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইরান ভয়াবহ খাদ্য সংকটে পড়বে। মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক উত্তজনায় দেশটির অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”
ইরানে মূল্যস্ফীতির রেকর্ড ও রপ্তানি নিষিদ্ধ
ইরান বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি তথ্যমতে:
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়া মাসে ইরানে খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার ১০৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইরান সরকার সব ধরনের কৃষিপণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে।
দেশটির কৃষিমন্ত্রী গোলামরেজা নুরি-ঘেজেলজেহ নাগরিকদের আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত পণ্য মজুদ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ঝুঁকিতে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন
নেদারল্যান্ডসের লাইডেন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান হেন্ডারসন মনে করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা ইয়েমেন, সুদান ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলোও তীব্র খাদ্যঘাটতির মুখে পড়বে। সৌদি আরব বা আমিরাতের আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও নিজস্ব গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় কুয়েত, কাতার ও বাহরাইন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
বিকল্প পথের সন্ধান ও সীমাবদ্ধতা
সংকট মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন বিকল্প পথ খুঁজছে। তবে তাতেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা:
সৌদি আরব: লোহিত সাগরের বন্দরগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে।
দুবাই: জেবেল আলী বন্দরের বিকল্প হিসেবে ‘ফুজাইরা’ বন্দরকে ভাবা হচ্ছে।
সীমাবদ্ধতা: ফুজাইরা মূলত জ্বালানি ও সার রপ্তানির জন্য নির্মিত। জেবেল আলীর মতো বিশাল কন্টেইনার হ্যান্ডেল করার সক্ষমতা সেখানে নেই।
বিশ্লেষকদের অভিমত: বিকল্প পথে খাদ্য আমদানির চেষ্টা করা হলেও এতে পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যেতে পারে, যা রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

