
চাপাইনবাবগঞ্জের অফ-সিজন আমের বাজারে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। গত কয়েক বছর ধরে কেজিতে ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি হওয়া কাটিমন আম এখন ১৫০-১৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। দাম কমে যাওয়ায় অনেক ক্রেতাই মনে করছেন, এই সুস্বাদু আমের বিপ্লব হয়তো ফুরিয়ে গেছে।
তবে কৃষি কর্মকর্তা এবং কৃষকরা দাবি করছেন ভিন্ন কিছু। তাদের মতে, এটি বিপ্লবের সমাপ্তি নয়, বরং একটি পরিবর্তনের নতুন ধাপ। কাটিমন আম এখন শুধু অফ-সিজনেই নয়, সারাবছরই পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে, অফ-সিজনেই বাজারে আসছে ব্যানানা, আশ্বিনা এবং বারি-১১ এর মতো নতুন জাত।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর কানসাট বাজারে দেখা যায়, অফ-সিজন আমের বাজার জমজমাট। শত শত ভ্যানে বোঝাই করে আম নিয়ে আসছেন কৃষকরা। অফ-সিজন আমের এই চাহিদা পূরণে কাটিমন ছাড়া অন্যান্য জাতের আমের চাষও বাড়ছে।
কৃষকরা জানান, গত কয়েক বছর ধরে কাটিমন আম চাষে লাভবান হয়েছেন তারা। অফ-সিজনেই আম বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছেন। তবে এখন অন্যান্য জাতের আমের চাষ বেড়ে যাওয়ায় কাটিমন আমের দাম কিছুটা কমে গেছে।
কানসাট বাজারের একজন চা বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, “কয়েক বছর আগেও এই সময় আম বিক্রি হতো না। এখন প্রতিদিন শত শত ভ্যান ভর্তি আম আসে।”
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, খিরসাপাত, ব্যানানা এবং আশ্বিনা আমের চাষ সাধারণত জুন-জুলাই মাসে শেষ হয়। তবে কৃষকরা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে সেপ্টেম্বর মাসেও বাজারে আম আনছেন।
শিবগঞ্জের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া জানান, প্রতিদিন কানসাট বাজারে প্রায় ৪০০-৫০০ টন কাটিমন আম বেচাকেনা হচ্ছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬-৭ কোটি টাকা। এই প্রবণতা আগামী কয়েক মাস ধরে অব্যাহত থাকবে।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, সাপাহার বাজারেও প্রতিদিন প্রায় ৫০-৬০ মণ আম বিক্রি হচ্ছে।
চাপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি এবং বাংলাদেশ আম উৎপাদনকারী-বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ জানান, মূল আম মৌসুমে চাপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৪,০০০-৫,০০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হয়। অন্যদিকে, অফ-সিজন কাটিমন আম থেকে গত কয়েক বছর ধরে অতিরিক্ত ৪০০-৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আসছে। অফ-সিজন আমের বিপ্লব কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ এবং চাপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কাটিমন আমের চাষ খুব কম ছিল। কিন্তু ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে এটি বেড়ে ৪,৭৫৭ হেক্টরে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু চাপাইনবাবগঞ্জেই রয়েছে ৪,৪৬২ হেক্টর।
অফ-সিজন আমের চাহিদা মেটাতে কৃষকরা কলম করার মাধ্যমে কাটিমন আম চাষ করছেন। কৃষকরা জানান, কলম করার মাধ্যমে কাটিমন আম চাষে লাভবান হচ্ছেন তারা।
তবে কিছু কৃষি কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, ফুল ছাঁটাই এবং হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে আম চাষে ঝুঁকি রয়েছে।
গবেষকরা আগামী ২-৩ বছরের মধ্যে বাজারে চারটি নতুন বিলম্বিত আমের জাত আসার আশা করছেন। এর মধ্যে দুইটি জাত চাপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র এবং অন্য দুইটি জাত চাপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্র তৈরি করছে।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরাফ উদ্দিন জানান, বারী আম-১৯ এবং বারী আম-২০ আগামী বছরের মধ্যে বাজারে আসবে।
উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্রের উপ-পরিচালক এম খালেদুর রহমান জানান, তারা কাননভোগ এবং বিলম্বিত আম্রপালি নামক দুইটি জাত তৈরি করছেন।
অফ-সিজন আমের বিপ্লব বাংলাদেশে কৃষি খাতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। তবে দাম কমে যাওয়ায় কাটিমন আমের বিপ্লব হয়তো শেষ হয়েছে এমন ধারণা ভুল। অফ-সিজন আমের চাহিদা পূরণে অন্যান্য জাতের আমের চাষ বাড়ছে। কৃষি কর্মকর্তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে অফ-সিজন আমের বাজার আরও জমজমাট হবে।

