
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে সবজি রপ্তানি খাতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ওই অঞ্চলের আকাশপথ ও বিমানবন্দরগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় প্রধান বাজারগুলোতে পণ্য পাঠানো কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারক, আমদানিকারক ও উৎপাদনকারী কৃষকরা তীব্র অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
রপ্তানি বন্ধের প্রভাব ও বর্তমান অবস্থা
রপ্তানিকারকদের সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে বাংলাদেশ থেকে সবজি পাঠানো বন্ধ রয়েছে। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কুয়েতে বাংলাদেশের মোট সবজি রপ্তানির একটি বড় অংশ যায়। এর মধ্যে রয়েছে লাউ, কুমড়া, পটোল, বেগুন, ঢেঁড়স, আলু, পেঁপে, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, কাঁচা মরিচ, বরবটি, শিম, টমেটো ও বিভিন্ন ধরনের শাক। এসব পণ্য পচনশীল হওয়ায় আলু ছাড়া বাকিগুলো পরিবহনে কার্গো বিমানের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান সংকটে নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট না থাকায় রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ মনসুর জানান, দেশের মোট সবজি রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে এবং বাকি ৪০ শতাংশ ইউরোপে যায়। তবে ইউরোপে পাঠানো পণ্যের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দর হয়ে ট্রানজিট নেয়ায় সেখানেও রপ্তানি কমেছে। বর্তমানে মোট রপ্তানি কার্যক্রমের মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ সচল রয়েছে।
কৃষিপণ্য ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানিকৃত কৃষিপণ্যের বড় অংশই ‘ফ্রেশ’ বা দ্রুত নষ্ট হওয়ার উপযোগী। এগুলো দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে বিমানপথই একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আকাশপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এতে ব্যবসায়ীর পাশাপাশি কৃষকরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
প্রতিযোগী দেশগুলো সুযোগ নিচ্ছে
দীর্ঘমেয়াদে বাজার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই সংকটের সুযোগে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তান বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পণ্য পৌঁছে দিতে সক্ষম হচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের মুম্বাই বন্দর থেকে সমুদ্রপথে মাত্র তিন দিনের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সবজি পৌঁছানো সম্ভব। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি।
এছাড়া পরিবহন খরচেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে বিমানযোগে সবজি পাঠাতে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ বেশি ভাড়া দিতে হয়। সংকটের মধ্যেও কার্গোভাড়া কমানোর বদলে কিছু ক্ষেত্রে বাড়ানো হয়েছে, যা রপ্তানি কার্যক্রমকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অবকাঠামো ও নীতিগত দুর্বলতা
দীর্ঘদিন ধরে দেশের সবজি রপ্তানি খাতে নীতিমালা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। বিমান কার্গো ভাড়ার ওপর সরকারের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ নেই, ফলে বিমান সংস্থাগুলো নিজেদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করে। সমুদ্রবন্দরগুলোতেও আধুনিক কোল্ড চেইন, বিশেষ কনটেইনার সুবিধা ও কৃষিপণ্য হ্যান্ডলিংয়ের পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। ফলে সমুদ্রপথে পচনশীল সবজি পাঠানো প্রায় অসম্ভব।
এছাড়া সরকারি প্রণোদনা কমিয়ে আনার বিষয়টিও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আগে সবজি রপ্তানিতে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নগদ সহায়তা দিলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে গেছে।
রপ্তানি পরিস্থিতির অবনতি
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের সবজি রপ্তানি ৩৮.৬৪ শতাংশ কমেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ কোটি ২৪ লাখ ডলারের সবজি রপ্তানি হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ৮ কোটি ১১ লাখ ডলারে।
বিকল্প পথের সন্ধান ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বিকল্প বাজার খোঁজার ওপর জোর দিয়েছেন। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালদ্বীপ, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সেখানে পৌঁছাতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে উৎপাদন ও প্যাকেজিং নিশ্চিত করা জরুরি।
কৃষি বিশেষজ্ঞ মজিবুল হকের মতে, ইরান-ইসরায়েল সংকটের কারণে বাংলাদেশের সবজি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারত বিকল্প পথে পণ্য পাঠাতে পারলেও বাংলাদেশের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এর প্রধান কারণ। তিনি একটি পাঁচ থেকে ১০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন বা রোডম্যাপ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। শুধু কাঁচা সবজি রপ্তানি নয়, বরং ফ্রোজেন সবজি, রেডি-টু-কুক ও রেডি-টু-ইট পণ্যের বাজার ধরার পরামর্শ দেন তিনি। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হলেও কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।
সাবেক কৃষিসচিব আনোয়ার ফারুকও একই মত প্রকাশ করে বলেন, শুধু আকাশপথের ওপর নির্ভর না করে সমুদ্রপথে সবজি পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় কোল্ড স্টোরেজ ও অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ফ্রোজেন ও প্রক্রিয়াজাত সবজির ওপর জোর দিতে হবে।
সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

