সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)। সংস্থাটির ‘অ্যান্টিসিপেটরি অ্যাকশন’ বা আগাম সতর্কতামূলক কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজারেরও বেশি পরিবারকে নগদ ৫ হাজার টাকা করে প্রদান করা হয়েছে।
গত ২৯ এপ্রিল থেকে এই অর্থ বিতরণ শুরু হয়, যা বন্যার মূল প্রকোপ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগেই পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
দুর্যোগের আগেই সহায়তা: এক নতুন মডেল
সাধারণত দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও, ডব্লিউএফপি-র এই কর্মসূচিটি মূলত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও নির্দিষ্ট ঝুঁকির মাত্রার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। পানি বাড়ার আগেই এই সহায়তা দেওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো:
শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ করতে পারবে।
গবাদিপশু ও গৃহস্থালি সম্পদ রক্ষা করতে পারবে।
নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারবে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-র ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর সিমোন পার্চমেন্ট সিলেট থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকালে বলেন:
“জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এখন আরও ঘনঘন ও মারাত্মক হয়ে উঠছে। আগাম পদক্ষেপের ফলে পরিবারগুলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সম্পদ রক্ষা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনার সময় ও সম্পদ পাচ্ছে।”
সরকারি সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীতে বাড়তি অনুদান
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) কেবল নিজস্ব তালিকায় নয়, বরং সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর (Social Safety Net) অন্তর্ভুক্ত আরও ৪,৪০০টি পরিবারকে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে অতিরিক্ত নগদ অর্থ প্রদান করছে। সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় আরও কার্যকর করতে এই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থায়ন ও সহযোগী সংস্থাসমূহ
এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমটি বাস্তবায়িত হচ্ছে ডব্লিউএফপি-র ট্রাস্ট ফান্ড এবং ইউরোপীয় কমিশনের ‘ডাইরেক্টরেট জেনারেল ফর ইউরোপিয়ান সিভিল প্রোটেকশন অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান এইড অপারেশনস’ (ECHO)-এর অর্থায়নে। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে এই কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে আসছে:
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)
জার্মানি ও আয়ারল্যান্ড
কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (KOICA)
বিনিয়োগ ও সুফল: ১ ডলারে ৭ ডলারের সাশ্রয়
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP)-র গবেষণা অনুযায়ী, আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগ করলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো এবং অন্যান্য সুবিধার মাধ্যমে প্রায় ৭ ডলারের সমান সুফল পাওয়া যায়। ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেক্স ২০২৪ অনুযায়ী, দুর্যোগ ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বে নবম স্থানে রয়েছে।
বর্তমান বন্যা পরিস্থিতি
গত ২৯ এপ্রিল পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (FFWC) সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও সিলেটে পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছিল। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারের চারটি প্রধান নদী— ভোগাই-কংস, সোমেশ্বরী, মগড়া এবং মনু নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে, যার ফলে নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে।

