Wednesday, 21 October, 2026

কৃষকের স্বস্তি দুই সপ্তাহে দ্বিগুণ পেঁয়াজের দাম


দেশের পাইকারি বাজারে দ্বিগুণ বাড়লো পেঁয়াজের দাম। পচন ও সংরক্ষণাগারের অভাবে সরবরাহ কমায় স্বস্তিতে চাষি, তবে খুচরায় ৫০-৬০ টাকা কেজিতে বিপাকে ভোক্তা।

গত কয়েক মাস ধরে দেশের প্রধান প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলাগুলোতে অব্যাহত দরপতন ও ক্রমাগত লোকসানের বোঝা টানছিলেন কৃষকেরা। তবে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। এর ফলে উৎপাদন খরচের চিন্তা থেকে সাময়িক স্বস্তি ও হাসির মুখ দেখেছেন পেঁয়াজ চাষিরা।

তবে পাইকারি বাজারে এই দাম বৃদ্ধির প্রভাবে খুচরা বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটি কিনতে গিয়ে নতুন করে পকেটে চাপ পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও পাবনার পাইকারি বাজারের চিত্র

আরো পড়ুন
কৃষিকে লাভজনক করতে গবেষণা ও কোল্ড স্টোরেজে জোর দেওয়ার আহ্বান: রাষ্ট্রপতি
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত

কৃষি খাতে যেসব জায়গায় ঘাটতি রয়েছে, তা গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষিকে লাভজনক করতে সরকারি সহায়তা ও Read more

রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি টাকার সার কিনছে সরকার
রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি টাকার সার কিনছে সরকার

রাশিয়া, কানাডা ও সৌদি আরব থেকে ৯৬৯ কোটি ৪৭ লাখ ১৪ হাজার ৮৫০ টাকার পটাশিয়াম (এমওপি) ও ডিএপি সার কেনার Read more

ফরিদপুর ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন পাইকারি হাট ঘুরে এবং কৃষক, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে:

  • জুলাইয়ের মাঝামাঝি: গুণগত মানভেদে প্রতি মণ (৩৭.৩২ কেজি) পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছিল মাত্র ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়।

  • পরবর্তী বৃদ্ধি: কয়েকদিনের মধ্যে সর্বোচ্চ দর বেড়ে প্রতি মণ ১,৬০০ থেকে ১,৯০০০ টাকায় পৌঁছে যায়।

  • বর্তমান দর: বর্তমানে দাম সামান্য নেমে এসে প্রতি মণ ১,৫০০ থেকে ১,৭০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে।

একই চিত্র দেখা গেছে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা পাবনাতেও। সুজানগর ও পুষ্কপাড়া হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি সপ্তাহে প্রতি মণ পেঁয়াজে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। পাবনার পাইকারি বাজারে বর্তমানে ভালোমানের পেঁয়াজ ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা মণে বিক্রি হচ্ছে।

দাম বাড়ার পেছনে ৪ মূল কারণ:

  1. তীব্র তাপ ও বৃষ্টিতে পচন: অতিরিক্ত গরম, টানা বৃষ্টি এবং উপযুক্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে কৃষকের ঘরে রাখা প্রচুর পেঁয়াজ পচে গেছে। কৃষকদের মতে, হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই ঘরে নষ্ট হয়ে গেছে।

  2. ওজন কমে যাওয়া: দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে শুকিয়ে গিয়ে পেঁয়াজের ওজন কমে গেছে।

  3. পাটের মৌসুমে ব্যস্ততা: প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে কৃষকেরা এখন পাট কাটতে ব্যস্ত থাকায় বাজারে পেঁয়াজ সরবরাহে সাময়িক ভাটা পড়েছে।

  4. সরবরাহ ২৫% হ্রাস: এসবের সমন্বিত প্রভাবে পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের সার্বিক সরবরাহ গত দুই সপ্তাহে প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে।

মেগা উৎপাদন সত্ত্বেও কেন এই সংকট?

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ফরিদপুর জেলায় ৪৭,০৩৬ হেক্টর জমি থেকে রেকর্ড ৭ লাখ ৫১,৬৩৫ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের মৌসুমের (৫৯৩,২৩৯ টন) চেয়ে অনেক বেশি। একইভাবে পাবনা জেলায় ৫৪,৩৩৫ হেক্টর জমিতে রেকর্ড ৯ লাখ ৯৫,৩৬৭ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে।

জাতীয়ভাবে দেশে বার্ষিক ৪৫ থেকে ৪৬ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে উৎপাদিত হয়েছে রেকর্ড ৪৯ লাখ টন (৪.৯ মিলিয়ন টন) পেঁয়াজ। উদ্বৃত্ত উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং পোস্ট-হারভেস্ট (ফসল কাটার পরবর্তী) অপচয়ের কারণে পর্যাপ্ত পণ্য বাজারে পৌঁছাতে পারছে না। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (DAM) মতে, দেশের মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৫০ শতাংশ এখনও কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষিত থাকলেও তার একটি বড় অংশ পচনের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এক নজরে পেঁয়াজ বাজারের হালচাল:

বাজারের ধরনদুই সপ্তাহ আগের দামবর্তমান দাম
পাইকারি দাম (প্রতি মণ)৭৫০ – ৯০০ টাকা১,৫০২০ – ২,০০০ টাকা
খুচরা দাম (টিসিবি তথ্য)৩৫ – ৪৫ টাকা (প্রতি কেজি)৫০ – ৬০ টাকা (প্রতি কেজি)
কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন খরচ৩২ টাকা+/কেজি (প্রতি বিঘায় ৬০,০০০০০-৭০,০০০ টাকা)সর্বনিম্ন ৪০ টাকা/কেজি হলে লাভজনক

চাষি ও কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার বস্তাপট্টি গ্রামের কৃষক বাবু মিয়া ও সুকান্ত মণ্ডল জানান, কিছুদিন আগেও যে দাম ছিল তাতে উৎপাদন খরচ ওঠাই অসম্ভব ছিল। তবে বর্তমান দর বৃদ্ধির ফলে আগামী মৌসুমে আবারও পেঁয়াজ চাষের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন তাঁরা।

পাবনার সুজানগর উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের শীর্ষ পেঁয়াজ চাষি মো. কামরুজ্জামান জানান, চলতি বছর প্রতি বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষে খরচ হয়েছে ৬০,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা। তিনি মনে করেন, প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম ১,৫০০ টাকার ওপরে থাকলে চাষিরা অন্তত লাভের মুখ দেখবেন।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখে বলেন, “কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয় ৩২ টাকার বেশি। অথচ গত ৪ মাস ধরে কৃষকেরা ৩০ টাকার নিচে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হয়ে লোকসান গুনেছেন। কৃষকের বাঁচতে হলে কেজিপ্রতি ৪০ টাকার ওপরে দাম পাওয়া জরুরি ছিল। তাই কৃষকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই দাম বৃদ্ধি প্রয়োজন ছিল।”

0 comments on “কৃষকের স্বস্তি দুই সপ্তাহে দ্বিগুণ পেঁয়াজের দাম”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ