
প্রতি বছর সংরক্ষিত ধানে পোকামাকড়ের আক্রমণে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েন দেশের কৃষকরা। এই ক্ষতি নিরসনে আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিনির্ভর এক অভিনব উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। রাসায়নিকমুক্ত এই প্রযুক্তিটি সবার কাছে তুলে ধরতে সম্প্রতি ‘ডেভেলপমেন্ট অব স্মার্ট আল্ট্রাসনিক পেস্ট কন্ট্রোল সিস্টেম ফর পোস্ট-হারভেস্ট লস রিডাকশন ইন স্টোরড প্যাডি’ শীর্ষক এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন কার্যালয়ে এ কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (বাউরিক)।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আবদুল মজিদ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাউরিকের আরএলসি কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দকার মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঁইয়া।
প্রকল্পের প্রধান গবেষক ও কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়াল মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে সংরক্ষণকালীন সময়ে মোট ধানের প্রায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ পোকামাকড়ের আক্রমণে নষ্ট হয়। দেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পোকা ও ছত্রাকের বিস্তার বাড়ায় এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, “দেশের মোট ধান উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতি রোধ করা গেলে বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। একইসঙ্গে ধানের বীজের অঙ্কুরোদগম হার অন্তত ১০ শতাংশ বাড়াতে পারলে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন বীজ সাশ্রয় হবে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।”
নতুন প্রযুক্তি ‘গ্রেইন গার্ড’ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আওয়াল বলেন, এটি একটি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব আল্ট্রাসনিক ডিভাইস, যা মানুষের কানে অশ্রাব্য উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গ ধানের ক্ষতিকর পোকা ‘রাইস উইভিল’-এর স্নায়ুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং তাদের চলাচল, খাদ্যগ্রহণ ও প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। ফলে পোকাগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শস্য থেকে সরে যায়। এতে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই শস্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়।
গবেষণার ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করে প্রধান গবেষক জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে এই গবেষণার ধারণার সূত্রপাত। পরবর্তীতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় বাউরিকের অধীনে এজ (ইডিজিই) সাব-প্রকল্পের মাধ্যমে দেড় বছর মেয়াদি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তাঁর নেতৃত্বে ও সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. এহসানুল কবিরের অংশগ্রহণে গবেষকদল ‘গ্রেইন গার্ড’-এর উন্নয়ন, নকশা, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ে যাচাই সম্পন্ন করেছেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, “কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনই ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি। ধান-চালের পোকামাকড়ের সমস্যার সমাধানে আগে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। আশা করছি, এই প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান ধান সংরক্ষণকে আরও আধুনিক ও টেকসই করবে।” একইসঙ্গে তিনি প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে আরও কাজ করার আহ্বান জানান।

