
দীর্ঘ লড়াই পেরিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মাঠজুড়ে এবার তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। খরা ও লবণাক্ততার বিরুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে গত এক দশক ধরে ঝুঁকেছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া ও বাড়তি উৎপাদনে স্বপ্ন দেখেছিলেন লাভের। কিন্তু হঠাৎ করেই পাইকারের অভাবে সেই স্বপ্নে ভাঙন ধরেছে। হাসির বদলে হতাশা আর উদ্বেগ এখন তরমুজচাষিদের নিত্যসঙ্গী।
বরিশাল বিভাগে চলতি বছর ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রতি হেক্টরে ৫৫ টন ধরে মোট ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ টন তরমুজ উৎপাদিত হবে। কিন্তু ক্রেতা সংকটে কৃষকেরা সেই উৎপাদিত ফসল তুলতে পারছেন না, বিক্রি নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
পটুয়াখালী-বরগুনায় আবাদের আধিক্য
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তরমুজের আবাদ হয়েছে পটুয়াখালী জেলায়—৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে। এরপর ভোলায় ১৯ হাজার ৭৫৩ হেক্টর, বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর, বরিশালে ২ হাজার ৭০৫ হেক্টর, পিরোজপুরে ৩৯৬ হেক্টর ও ঝালকাঠিতে ১২৭ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে।
বরগুনার আমতলী উপজেলায় এ বছর ৪ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। অনুকূল আবহাওয়ায় ফলনও হয়েছে ভালো। স্থানীয় কৃষকদের লক্ষ্য ছিল প্রায় ২৭০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রি করা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বড় ক্রেতার অভাবে বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
মাঠে পেকে পড়েছে তরমুজ, নেই ক্রেতা
সোমবার আমতলীর হলদিয়া, চাওড়া, আঠারোগাছিয়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক খেতে তরমুজ পেকেও গেছে, কিন্তু ক্রেতা না থাকায় কৃষকেরা তা তুলছেন না। কোথাও কোথাও তরমুজ কেটে খেতে ফেলে রাখা হয়েছে।

হলদিয়া গ্রামের চাষি আল আমিন জানান, প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। তিনি আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে বিনিয়োগের টাকাও উঠবে না।
চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা গ্রামের চাষি মামুন মোল্লা বলেন, গত কয়েক বছর দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় ব্যবসায়ীরা এখানে এসে খেত থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যেতেন। কিন্তু এবার তাঁরা আসছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
পটুয়াখালীতেও একই চিত্র
শুধু বরগুনা নয়, পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায়ও একই অবস্থা। কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের চরচান্দুপাড়া গ্রামের কৃষক ফেরদৌস তালুকদার জানান, চলতি বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেন। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলন ভালো হলেও বাজারে সঠিক মূল্য না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন।
তিনি বলেন, “গত বছর যেখানে দুই গাড়ি তরমুজ প্রায় নয় লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সেখানে এবার দুই লাখ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। ২ হাজার ২০০ টাকা মণ দরের তরমুজ এখন ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।” পাইকার না আসা এবং মোকামে চাহিদা কমে যাওয়ায় অন্তত ১২ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
কলাপাড়া কৃষি কার্যালয় জানিয়েছে, এ বছর কলাপাড়ায় প্রায় তিন হাজার চাষি ৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। বাজার পরিস্থিতিতে অর্ধেক চাষি লোকসানে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চাহিদা কমেছে উত্তরে বাড়তি আবাদে
দেশের কৃষিপণ্য বিপণনে দায়িত্বে থাকা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মাহবুব আলম বলেন, “এবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চরাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা অনেকটা কম। তবে এখন মৌসুম কেবল শুরু হয়েছে। যাঁরা আগাম তরমুজ উৎপাদন করেছেন, তাঁদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে। দিন যত যাবে, তরমুজের চাহিদা তত বাড়বে।”
তবে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে দ্রুত বড় ব্যবসায়ীদের সক্রিয় করা না গেলে চাষিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন।
জলবায়ু মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা, বিপণনে দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। নদীবেষ্টিত দক্ষিণের এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় জমি পানির নিচে থাকা এবং জোয়ার-ভাটার ফলে পলিমাটি জমে উর্বরতা বাড়ে। ফলে তুলনামূলক কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা ও খরায় ফসলহানি ঘটলেও তরমুজ চাষে টিকে ছিলেন কৃষকেরা। এবার ফলন ভালো হলেও বিপণনের দুর্বলতা কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

