রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মাটির উর্বরতা বাড়াতে রংপুর অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে জৈব সার প্রস্তুত ও ব্যবহারের প্রবণতা আশানুরূপভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শীতকালীন শাকসবজি চাষিদের মধ্যে এই পরিবর্তনের রূপ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অনেক কৃষক নিজের জমিতে ব্যবহারের জন্য ঘরেই জৈব সার তৈরি করছেন, আবার কেউ কেউ তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার খন্দনেরহাট গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী কৃষক নগেন্দ্র নাথ রায় জানান, গত বছর ১৬ বিঘা জমিতে তিনি প্রধানত রাসায়নিক সার ব্যবহার করেছিলেন। তবে এ বছর তিনি সেই কৌশল বদলে নিজের তৈরি ও অন্য কৃষকদের কাছ থেকে সংগৃহীত জৈব সার ব্যবহার করছেন। মাটির উর্বরতা কমে যাওয়া এবং বাজারে চাহিদামতো রাসায়নিক সার না পাওয়ার কারণেই তিনি জৈব সারের দিকে ঝুঁকেছেন।
একই চিত্র লালমনিরহাট সদরের তাজপুর গ্রামের মোজাম্মেল হকের ক্ষেত্রেও। তিনি এ বছর গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করছেন। তার মতে, কেবল জৈব সার ব্যবহারে ফলন কিছুটা কম হলেও তা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকারী।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলায় বিপুলসংখ্যক কৃষক এখন জৈব সার উৎপাদন, ব্যবহার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। অঞ্চলটির প্রায় ১৬ হাজার কৃষক বাণিজ্যিকভাবে জৈব সার তৈরি করে লাভবান হচ্ছেন, যাদের প্রত্যেকে বছরে প্রায় ১০ টন পর্যন্ত সার তৈরি করতে সক্ষম।
‘ভার্মিকম্পোস্ট’ বা কেঁচো সার
জৈব সারের মধ্যে গোবর ও পচনশীল বর্জ্য দিয়ে কেঁচোর সাহায্যে তৈরি ‘ভার্মিকম্পোস্ট’ বা কেঁচো সার সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। লালমনিরহাটের চওড়াতারী গ্রামের কৃষক আজহারুল ইসলাম গত ছয় বছর ধরে বছরে ১০ টনের মতো জৈব সার তৈরি করছেন। নিজের জমিতে ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত সার বিক্রি করে তিনি ভালো আয় করছেন। তিনি জানান, কেজিপ্রতি ৭-৮ টাকা খরচে তৈরি এই সার গত বছর ১৪-১৫ টাকায় বিক্রি হলেও চলতি বছর চাহিদা দ্বিগুণ হওয়ায় কেজিতে আরও ৪-৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
তবে কৃষকরা জৈব সারকে রাসায়নিক সারের পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছেন না। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আবু বকর সাইফুল ইসলাম জানান, রাসায়নিক সার দ্রুত উদ্ভিদের পুষ্টি জোগায়, আর জৈব সার মাটির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা উন্নত করে। ফসলভেদে প্রতি বিঘায় ৬০-৭০ কেজি জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি সুষম মাত্রায় রাসায়নিক সার প্রয়োগের পরামর্শ দেন তিনি।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞানী সফিনুর রহমান জানান, উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু অঞ্চলের মাটিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি ও অম্লতা রয়েছে। তাই মাটি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে রাসায়নিক ও জৈব সারের যৌথ ব্যবহারই মাটির স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার সেরা উপায়।

