Sunday, 01 November, 2026

বাংলাদেশের ইলিশ বাণিজ্যে উল্টো হাওয়া: উৎপাদনে ধস, ভারতের গুজরাট থেকে এলো ৫০০ টন ইলিশ


দেশে উৎপাদন কমায় ভারতের গুজরাট থেকে এল ৫০০ টন ইলিশ। কমছে বাংলাদেশের ইলিশ, বাড়ছে ভারতের বাজারে

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রপ্তানির এক ঐতিহ্যগত ধারা বজায় ছিল। বিশেষ করে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের বাজারে বাংলাদেশের সুস্বাদু ইলিশের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। তবে সেই পরিচিত চিত্রে দেখা দিয়েছে চরম বিপরীতমুখী প্রবাহ। দেশে ইলিশের ধারাবাহিক উৎপাদন কমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারের সংকট কাটাতে ভারতের গুজরাট থেকে উল্টো ইলিশ আমদানি শুরু করেছে বাংলাদেশ।

ভারতের মৎস্য ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে গুজরাট থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছে। এছাড়া আরও ১৫০ থেকে ২০০ টন ইলিশ শিগগিরই আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ভারতে উৎপাদিত এসব ইলিশের সিংহভাগই পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া পাইকারি মাছ বাজার হয়ে গুজরাটের ভরুচ অঞ্চল থেকে বাংলাদেশে আনা হচ্ছে।

যে দেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ ভারতের বাজারে আভিজাত্যের প্রতীক ছিল, সেই বাংলাদেশের বাজারেই এখন ভারতীয় ইলিশের প্রবেশ ঘটায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা।

আরো পড়ুন
তেলাপিয়া মাছের শীতকালীন রোগ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক পরিচর্যা

বাণিজ্যিক মৎস্য চাষে তেলাপিয়া অন্যতম লাভজনক ও জনপ্রিয় মাছ। তবে শীতকালে তাপমাত্রা হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে পুকুরের পরিবেশ এবং মাছের Read more

স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি: কম খরচে লাভজনক আনারকলি (Passion Fruit) চাষ পদ্ধতি ও যত্ন
বাংলাদেশে আনারকলি চাষ

বাংলাদেশের কৃষিতে সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রচলিত ফল ও সবজি চাষে বিপ্লব ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি উচ্চমূল্যের ও লাভজনক নাম হলো Read more

দেশে ইলিশ উৎপাদনে ধস, বিপরীতে গুজরাটে বৃদ্ধি

মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৯৮৭ সাল থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ছিল। তবে ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো এই প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক ধস নামে।

  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ইলিশের উৎপাদন কমেছে ৭.৩৩ শতাংশ।

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: উৎপাদন আরও ৫.৫১ শতাংশ কমে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে আসে।

  • ২০২৫-২৬ অর্থবছর: চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশ না হলেও মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিগত বছরে ইলিশ আহরণ আরও হ্রাস পেয়েছে।

অন্যদিকে ভারতের গুজরাট উপকূলে ইলিশের রেকর্ড ফলন দেখা গেছে। ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গুজরাটে ইলিশের উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪,৫৮৭.৭২ টনে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে কেবল নর্মদা নদী সংলগ্ন ভরুচ এলাকাতেই উৎপাদিত হয়েছে প্রায় ৭,৪১০ টন ইলিশ। প্রতিবছর পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা গুজরাট থেকে ৫০০-৭০০ টন ইলিশ সংগ্রহ করলেও এবার বড় একটি অংশ বাংলাদেশে পাঠাচ্ছেন তারা।

‘গুজরাটের ইলিশে ডিম বেশি, তবে স্বাদ কম’

বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনা অববাহিকার ইলিশের সাথে অন্য অঞ্চলের ইলিশের স্বাদের তফাত সর্বজনবিদিত। হাওড়া হোলসেল ফিশ ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মাকসুদ জানান:

“পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের চাহিদা সবসময়ই তুঙ্গে। গুজরাটের ইলিশগুলোতে ডিমের পরিমাণ বেশি পাওয়া গেলেও পদ্মার মাছের মতো সেই স্বাদ ও ঘ্রাণ নেই। তবে সেখানে অতিরিক্ত উৎপাদন হওয়ায় উদ্বৃত্ত একটি অংশ বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে।”

তবে আমদানির এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন বাংলাদেশ ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. নিজাম উদ্দিন। তিনি জানান, দেশীয় মাছের যোগান কমে যাওয়ার এই সময়ে আমদানিকৃত ইলিশ বাজারে ভারসাম্য আনছে।

তিনি বলেন, “বর্তমানে বাজারে ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। যদি এই আমদানি না হতো, তবে দেশের বাজারের সীমিত সরবরাহের কারণে প্রতি কেজি ইলিশের দাম ২,৭০০ থেকে ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকত।”

এক নজরে বাংলাদেশ ও গুজরাটের ইলিশ পরিস্থিতি:

সূচক / এলাকাবাংলাদেশ (সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান)গুজরাট, ভারত (২০২৫-২৬)
উৎপাদন প্রবণতাধারাবাহিকভাবে হ্রাসমান (-৭.৩৩% ও -৫.৫১%)।গত ৪ বছরের মধ্যে রেকর্ড (১৪,৫৮৭.৭২ টন)।
প্রধান কারণজাটকা নিধন, নদীদূষণ ও নাব্যতাসংকট।নর্মদা নদীতে আহরণ ও প্রজনন বৃদ্ধি।
আমদানিকৃত পরিমাণগত ২ মাসে ৫০০ টন (প্রক্রিয়াধীন ১৫০–২০০ টন)।ভরুচ থেকে হাওড়া হয়ে বাংলাদেশে রপ্তানি।
বাজারমূল্য প্রভাবপ্রতি কেজি ২০০০–২২০০ টাকা (আমদানি না থাকলে ২৭০০–৩০০০ টাকা হতো)।–

কেন কমছে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ?

বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হিসেবে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন:

১. আইনের শিথিলতা: প্রজনন মৌসুমে ও জাটকা রক্ষায় প্রশাসনিক নজরদারি ও আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাব।

২. নদীদূষণ ও পলি পড়া: প্রধান প্রধান নদীগুলোর মোহনায় পলি জমে নাব্যতাসংকট তৈরি হওয়া এবং প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্যের দূষণে ইলিশের বিচরণপথ রুদ্ধ হওয়া।

৩. অনিয়ন্ত্রিত আহরণ: জাটকা বয়সেই ইলিশ নিধন করায় পরিপক্ব ইলিশ হওয়ার সুযোগ কমে যাওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীগুলোর নাব্য বজায় রাখা ও প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করলে দেশের প্রথাগত ইলিশ সম্পদ বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিতে পড়বে।

0 comments on “বাংলাদেশের ইলিশ বাণিজ্যে উল্টো হাওয়া: উৎপাদনে ধস, ভারতের গুজরাট থেকে এলো ৫০০ টন ইলিশ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ