
গত মাসের আকস্মিক ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতে উত্তরবঙ্গের রংপুর অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে আলু ও ভুট্টা চাষীরা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন। আলুর ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেক কৃষক ভুট্টার দিকে ঝুঁকেছিলেন, কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে সেই আশাও এখন ম্লান হতে চলেছে।
ভুট্টা চাষীদের স্বপ্নভঙ্গ
পোল্ট্রি ও গবাদি পশুর খাদ্যের চাহিদা থাকায় গত কয়েক বছরে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধায় ভুট্টা চাষের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই পাঁচ জেলায় ১.২৭ লক্ষ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। তবে মার্চ মাসের বৃষ্টিতে ৫২০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রভাব চরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি।

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধন এলাকার ৬০ বছর বয়সী কৃষক নূরজাহান বেগম ১.৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছিলেন। তিনি জানান, ঝড়ে তাঁর প্রায় ৬০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বিনিয়োগ হারিয়ে এখন পুনরায় চাষাবাদের জন্য চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
আলু চাষীদের দ্বিমুখী সংকট
ঝড়বৃষ্টির আগে থেকেই আলুর বাজার দর ছিল উৎপাদন খরচের নিচে। ডিএই-এর হিসাবমতে, প্রতি কেজি আলুর উৎপাদন খরচ প্রায় ১৬.৬৪ টাকা হলেও কৃষকরা বিক্রি করছিলেন মাত্র ৮-৯ টাকায়। বৃষ্টির পর দাম কিছুটা বাড়লেও (১৩ টাকা) মাঠের ফসল পচে যাওয়ায় কৃষকরা সেই সুফল পাচ্ছেন না।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বারুনাগাঁওয়ের কৃষক রফিকুল ইসলাম ১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। তিনি জানান, মার্চের মাঝামাঝি সময়ে ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় তাঁর ৪ বিঘা জমির প্রায় ৪০ শতাংশ আলু মাটিতেই পচে গেছে। কাদা জমে যাওয়ায় মাঠ থেকে ফসল তোলাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ও পুনর্বাসন
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মনিটরিং ও বাস্তবায়ন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জামাল উদ্দিন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা সম্পন্ন হলে সরকার সহায়তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ডিএই-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, আলুর পর ভুট্টাই এই দুর্যোগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত ফসল। এছাড়া কলা, শাকসবজি এবং কিছু বোরো ধানক্ষেতও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফসল বিমার দাবি
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ‘বাংলাদেশ খেতমজুর ও কৃষক সংগঠন’। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলেও স্থায়ী কোনো ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা নেই। আমরা দীর্ঘকাল ধরে ‘ফসল বিমা’ চালুর দাবি জানিয়ে আসছি।” তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।
একইভাবে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন গত ২৫ মার্চ কৃষি মন্ত্রণালয়কে দেওয়া এক চিঠিতে ক্ষতিগ্রস্ত আলু চাষীদের কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় আনার অনুরোধ জানিয়েছে। তারা জানায়, জলাবদ্ধতার কারণে আলুর গুণমান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বর্তমানে ৫-৬ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা বাজারদরের চেয়ে অনেক কম।

