
লবণাক্ততার কারণে যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় জমি পড়ে থাকত অনাবাদী, কিংবা বর্ষায় কেবল আমন ধানের চাষ হতো, আজ সেই জমিও স্বপ্ন দেখাচ্ছে উপকূলের কৃষকদের। সুন্দরবন সংলগ্ন পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি এলাকায় লবণাক্ত জমিতে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে বার্লি চাষ করে অভাবনীয় সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় এক কৃষক। মিঠাপানির তীব্র অভাবের কারণে যে ফসলি জমি একসময় বছরের বেশিরভাগ সময় অনাবাদী থাকত, সেখানে এখন বাতাসে দুলছে সোনালী বার্লির শীষ। কৃষিবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে লবণাক্ত এলাকায় টেকসই কৃষি গড়ে তুলতে বার্লি হতে পারে এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
এক সময়ের পতিত জমি, আজ ফসলের খেত
একসময় মিঠাপানির অভাবে রবি মৌসুমে এই এলাকায় কোনো ফসল ফলানো সম্ভব হতো না। লবণাক্ততার কারণে জমিগুলো পড়ে থাকত বছরের অধিকাংশ সময়। বর্ষাকালে কিছুটা মিঠাপানির সুবাদে কেবল আমন ধান চাষ হতো। বাকি সময় লোনাপানি আটকে রেখে চিংড়ি চাষই ছিল প্রধান পেশা। তবে কৃষি গবেষণা বিভাগের অনুপ্রেরণায় পাইকগাছার কপিলমুনি এলাকার কৃষক মনিরুল ইসলাম এবার সেই পতিত লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে স্থানীয় অন্যান্য কৃষকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
উপকূলের কৃষকের নতুন ভরসা
বার্লি চাষী মনিরুল ইসলাম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, “জমিতে রবি ফসল হিসেবে আগে গম বা বোরো ধান চাষের চেষ্টা করতাম, কিন্তু লবণাক্ততার কারণে ফলন ভালো হতো না। এবার কৃষি গবেষণা বিভাগের পরামর্শে প্রথমবার এক বিঘা জমিতে বার্লি চাষ করেছি। কৃষি বিভাগ বিনামূল্যে বীজ, সার সবই দিয়েছে। শুরুতে চিন্তায় ছিলাম এই মাটিতে বার্লি হবে কিনা, কারণ আমি বা এখানকার কোনো কৃষকই এই ফসলের সাথে পরিচিত ছিলাম না। কিন্তু এখন ফলন দেখে খুব ভালো লাগছে। আশপাশের অনেক কৃষক আমার খেত দেখতে আসছেন, অনেকে বীজও রাখতে বলছেন।”
উচ্চ পুষ্টিগুণ ও বাজার সম্ভাবনা
বার্লি কেবল উৎপাদনশীলতায় নয়, পুষ্টিগুণেও অতুলনীয়। কৃষি বিভাগ জানায়, বার্লি উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন একটি শস্য। এটির আটা দিয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন রুটি, শিশুখাদ্য, স্যুপ তৈরি করা হয়। এমনকি রোগীর পথ্য হিসেবেও বার্লির ব্যবহার ব্যাপক। বাজারে এর চাহিদা এবং দামও ভালো। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, “দেশে বার্লির চাহিদা প্রচুর, কিন্তু উৎপাদন কম হওয়ায় আমাদের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানি করতে হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি বার্লিভিত্তিক শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।”
বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি-১০: লবণসহিষ্ণু জাতের সাফল্য
পাইকগাছায় পরীক্ষামূলকভাবে বারি বার্লি-৭ ও বারি বার্লি-১০ দুটি জাতই চাষ করা হয়েছে। এই জাতগুলো লবণসহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বারি বার্লি-৭ জাতটি খাটো এবং ৯০-১০৫ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়। অন্যদিকে, বারি বার্লি-১০-এর উচ্চতা ৯০-৯৫ সেন্টিমিটার। এটি লবণাক্ত জমিতেও হেক্টরপ্রতি গড়ে ২ থেকে ২ দশমিক ৪ টন ফলন দেয় এবং ৮০-৮৬ দিনের মধ্যে পাকতে শুরু করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক সহকারী জাহিদ হাসান জানান, “পাইকগাছার লবণাক্ত ভূমির জন্য বারি বার্লি-১০ তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী। এটি রবি মৌসুমে অন্যান্য ফসলের ঝুঁকি এড়াতে সক্ষম।”
উপকূলীয় কৃষির নতুন দিগন্ত
পাইকগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা একরামুল হোসেন বার্লিকে উপকূলীয় কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “বার্লি চাষ এ এলাকায় এটাই প্রথম এবং এটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তদারকি করছে। উপকূলীয় কৃষিতে বার্লি সংযোজন হলে সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।” প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম আরও যোগ করেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে কৃষকদের প্রচলিত চাষাবাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বিকল্প তৈরি করা জরুরি। বার্লি কেবল মানুষের খাদ্য হিসেবেই নয়, পশুখাদ্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
পাইকগাছার মনিরুল ইসলামের এই সাফল্য কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জয় নয়, এটি পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক নতুন আশার আলো। লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষের এই দিগন্ত প্রসারিত হলে উপকূলের পতিত জমিগুলো ভরে উঠবে সোনালী ফসলে, যা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে কৃষিবিদদের দৃঢ় বিশ্বাস।

