
ভেনামী চিংড়ি (Vannamei shrimp, Litopenaeus vannamei) চাষ বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে রোগবালাই এই চাষে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের ‘আমের রাজধানী’ হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি ও অর্থনীতি কয়েক যুগ ধরে আম কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও সাম্প্রতিক Read more
নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান) বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে আনাকে অত্যন্ত জরুরি বলে অভিহিত করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা Read more
ভেনামী চিংড়ি চাষে উল্লিখিত রোগগুলোর কারণ, লক্ষণ, প্রতিকার ও চিকিৎসা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো। মনে রাখতে হবে, বেশিরভাগ ভাইরাসজনিত রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, তাই প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১. Early Mortality Syndrome (EMS) / Acute Hepatopancreatic Necrosis Disease (AHPND)
কারণ: এটি একটি ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ, যা সাধারণত Vibrio parahaemolyticus নামক ব্যাকটেরিয়ার নির্দিষ্ট কিছু স্ট্রেন দ্বারা ঘটে। এই স্ট্রেনগুলো PirA এবং PirB নামক টক্সিন উৎপন্ন করে, যা চিংড়ির হেপাটোপ্যানক্রিয়াসের ক্ষতি করে।
লক্ষণ:
- চিংড়ি ছাড়ার প্রথম ৩০-৪০ দিনের মধ্যে ব্যাপক মৃত্যুহার দেখা যায়।
- হেপাটোপ্যানক্রিয়াস (যকৃত-অগ্নাশয় গ্রন্থি) সাদা ও ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
- চিংড়ির খাদ্যনালী প্রায় সম্পূর্ণ খালি থাকে।
- খোলস নরম হয়ে যায় এবং চিংড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে।
- অনেক সময় হেপাটোপ্যানক্রিয়াসে কালো দাগ দেখা যায়।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: রোগমুক্ত পোনা ব্যবহার করা, জৈব-নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে চলা, পুকুরের তলদেশ পরিষ্কার রাখা, অতিরিক্ত খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকা, এবং পানির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
- চিকিৎসা: নির্দিষ্ট কোনো ঔষধ নেই। তবে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত পানির গুণগত মান উন্নত করা এবং জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।
২. Enterocytozoon hepatopenaei (EHP)
কারণ: এটি একটি পরজীবীঘটিত রোগ, যা Enterocytozoon hepatopenaei (EHP) নামক মাইক্রোস্পোরিডিয়ান পরজীবী দ্বারা হয়। এই পরজীবী চিংড়ির হেপাটোপ্যানক্রিয়াসের কোষে বংশবৃদ্ধি করে।
লক্ষণ:
- চিংড়ির বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়।
- হোয়াইট ফিকাল সিন্ড্রোম (সাদা পায়খানা) দেখা যায়।
- সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না, তবে চিংড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে।
- রোগের তীব্রতা বাড়লে অন্যান্য ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগের সংক্রমণ হতে পারে।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: রোগমুক্ত পোনা ব্যবহার করা, পুকুরের তলদেশের কাদা ভালোভাবে শুকানো ও ব্লিচিং পাউডার দিয়ে শোধন করা, এবং জৈব-নিরাপত্তা বিধি মেনে চলা।
- চিকিৎসা: এই রোগের কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই। প্রতিরোধের উপরই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. Taura Syndrome Virus (TSV)
কারণ: এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা Taura Syndrome Virus (TSV) দ্বারা হয়।
লক্ষণ:
- চিংড়ির খোলসের ওপর লালচে বা কালচে দাগ দেখা যায়।
- চিংড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেয়।
- খোলস নরম হয়ে যায় এবং খোলস বদলানোর সময় মারা যায়।
- আক্রান্ত চিংড়ির ফুলকা ফোলা এবং কালো হতে পারে।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: ভাইরাস মুক্ত পোনা ব্যবহার করা, পুকুরের পানির গুণগত মান ঠিক রাখা এবং জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা মেনে চলা।
- চিকিৎসা: এটি একটি ভাইরাসঘটিত রোগ, তাই এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত রোগাক্রান্ত চিংড়ি অপসারণ করতে হবে।
৪. White Spot Syndrome Virus (WSSV)
কারণ: এটি একটি অত্যন্ত মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা White Spot Syndrome Virus (WSSV) দ্বারা ঘটে। এটি ভেনামী চিংড়ির জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর রোগগুলোর মধ্যে একটি।
লক্ষণ:
- চিংড়ির খোলস, উপাঙ্গ এবং ক্যারাপেজে (মাথার খোলস) সাদা সাদা দাগ দেখা যায়।
- খাদ্য গ্রহণ হঠাৎ করে বন্ধ করে দেয়।
- চিংড়ি অলস হয়ে পড়ে এবং পুকুরের পাড়ে জড়ো হয়।
- শরীর লালচে বর্ণ ধারণ করে।
- ২-৩ দিনের মধ্যে ব্যাপক মৃত্যুহার দেখা যায়।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: WSSV-মুক্ত পোনা ব্যবহার করা, পুকুর সঠিকভাবে শুকিয়ে ব্লিচিং পাউডার বা চুন দিয়ে শোধন করা, এবং খামারে জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে পালন করা।
- চিকিৎসা: এই ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই। রোগ দেখা দিলে দ্রুত সমস্ত চিংড়ি তুলে ফেলতে হবে এবং পুকুর ভালোভাবে শোধন করতে হবে।
৫. Yellow Head Virus (YHV)
কারণ: এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা Yellow Head Virus (YHV) দ্বারা হয়।
লক্ষণ:
- চিংড়ির মাথা (শিরোবক্ষ) এবং হেপাটোপ্যানক্রিয়াস হলুদ বা ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
- খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করে দেয়।
- চিংড়ি দুর্বল হয়ে পুকুরের পাড়ে বা জলের ওপরে ভাসতে থাকে।
- এই রোগে মৃত্যুহার খুব দ্রুত বেড়ে যায়।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: ভাইরাস মুক্ত পোনা ব্যবহার করা, পানির তাপমাত্রা ও অন্যান্য গুণগত মান স্থিতিশীল রাখা, এবং জৈব-নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে চলা।
- চিকিৎসা: কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই সর্বোত্তম।
৬. Infectious Hypodermal and Hematopoietic Necrosis Virus (IHHNV)
কারণ: এটি একটি ডিএনএ ভাইরাসজনিত রোগ, যা Infectious Hypodermal and Hematopoietic Necrosis Virus (IHHNV) দ্বারা ঘটে।
লক্ষণ:
- ভেনামী চিংড়ির ক্ষেত্রে এই রোগটি সাধারণত “Runt Deformity Syndrome” (RDS) নামে পরিচিত।
- চিংড়ির বৃদ্ধি কমে যায় এবং আকার ছোট হয়।
- খোলস ও শরীরের বিকৃতি দেখা যায়, যেমন বাঁকা rostrum।
- মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও সামগ্রিক উৎপাদন হ্রাস পায়।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: IHHNV-মুক্ত পোনা ব্যবহার করা এবং খামারে ভালো জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
- চিকিৎসা: কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
৭. Lymphoid Organ Vacuolization Virus (LOVV)
কারণ: এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা Lymphoid Organ Vacuolization Virus (LOVV) দ্বারা ঘটে।
লক্ষণ:
- এই রোগের নির্দিষ্ট বাহ্যিক লক্ষণ খুব কমই দেখা যায়।
- মূলত লিম্ফয়েড অর্গানে (Lymphoid Organ) ভ্যাকুওলাইজেশন (কোষে শূন্যস্থান সৃষ্টি) দেখা যায়।
- চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে অন্যান্য রোগের সংক্রমণ সহজ হয়।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: রোগমুক্ত পোনা ব্যবহার করা এবং পরিবেশগত চাপ কমানো।
- চিকিৎসা: নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই।
৮. Reo-like virus (REO)
কারণ: এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা রেও-ভাইরাসের মতো দেখতে একটি ভাইরাস দ্বারা ঘটে। এই ভাইরাস চিংড়ির হেপাটোপ্যানক্রিয়াসের ক্ষতি করে।
লক্ষণ:
- চিংড়ির হেপাটোপ্যানক্রিয়াস ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
- খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।
- বৃদ্ধি হ্রাস পায় এবং চিংড়ি দুর্বল হয়ে পড়ে।
- আক্রান্ত চিংড়ির মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কম।
প্রতিকার ও চিকিৎসা:
- প্রতিকার: রোগমুক্ত পোনা ব্যবহার করা, পানির গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং জৈব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- চিকিৎসা: কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
সব ধরনের ভাইরাসঘটিত রোগের ক্ষেত্রেই, প্রতিরোধই হলো সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। তাই চাষ শুরু করার আগে থেকেই পুকুরের সঠিক প্রস্তুতি, ভাইরাস-মুক্ত পোনা নির্বাচন, এবং কঠোর জৈব-নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

