কোরবানির ভাল ও সুস্থ গরু না চিনলে অনেক সময় রোগাক্রান্ত ও ওজন কম গরু কিনে ঠকতে হয়। কোরবানির ভাল ও সুস্থ গরু চেনার উপায় কি? কি কি উপায়ে কোরবানির গরু নির্বাচন করা যায়?
কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসলেই পশুর হাটে ধুম পড়ে যায় গরু কেনার। তবে হাটে গিয়ে অনেক সময় চকচকে বা মোটাতাজা গরু দেখে আমরা আকৃষ্ট হই, যা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। অসদুপায় অবলম্বন করে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা বা রোগাক্রান্ত গরু কিনে অনেকেই প্রতারিত হন।
একটি কোরবানির জন্য,স্বাস্থ্যসম্মত, বৈধ এবং নিখুঁত পশু নির্বাচন করা ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যগত উভয় দিক থেকেই জরুরি। নিচে কোরবানির ভালো ও সুস্থ গরু চেনার ১০টি সহজ উপায় বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
কোরবানির ভালো ও সুস্থ গরু চেনার ১০টি কার্যকর উপায়
১. গরুর সক্রিয়তা ও আচরণ লক্ষ্য করুন
একটি সুস্থ গরু সবসময় চঞ্চল ও সতর্ক থাকে। হাটে কেউ সামনে গেলে সে কান নাড়াবে, গা ঝাড়া দেবে বা চড়ার চেষ্টা করবে।
সতর্কতা: যদি দেখেন কোনো গরু একদম শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ডাকলে বা গুঁতো দিলেও নড়াচড়া করছে না, তবে বুঝবেন সেটি অসুস্থ বা তাকে অতিরিক্ত ওষুধ খাইয়ে ঝিমিয়ে রাখা হয়েছে।
২. চোখ এবং নাকের অবস্থা পরীক্ষা করুন
সুস্থ গরুর চোখ হবে উজ্জ্বল, সতেজ এবং পরিষ্কার।
গরুর নাকের ওপরের অংশটি (যাকে ‘মাজল’ বা ‘নাকানি’ বলা হয়) সবসময় কিছুটা ভেজা বা ঘাম ফোঁটার মতো দেখাবে। এটি সুস্থ গরুর অন্যতম বড় লক্ষণ।
চোখ যদি বসা বা ঘোলাটে হয় এবং নাক যদি একদম শুকনা থাকে, তবে সেই গরু না কেনাই ভালো।
৩. মুখের ভেতরের অংশ ও লালা দেখুন
গরুটির মুখের সামনে গিয়ে লক্ষ্য করুন সে জাবর কাটছে কি না। সুস্থ গরু সুস্থ অবস্থায় অনবরত জাবর কাটে।
গরুর মুখ থেকে যদি স্বাভাবিক লালা ঝরে, তবে তা ঠিক আছে। কিন্তু অতিরিক্ত ফেনা বা অনবরত আঠালো লালা পড়তে থাকলে বুঝতে হবে গরুটির মুখে ঘা বা অন্য কোনো রোগ (যেমন: ক্ষুররোগ) রয়েছে।
৪. গরুর বয়স ও দাঁত পরীক্ষা করুন
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানির গরুর বয়স অন্তত ২ বছর হতে হবে। বয়স নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো গরুর দাঁত দেখা।
গরুর নিচের পাটিতে স্থায়ী দাঁত বা ‘পোড়া দাঁত’ দেখতে হবে। সামনে অন্তত ২টি স্থায়ী দাঁত থাকলে বুঝতে হবে গরুটির বয়স ২ বছর হয়েছে। দুধের দাঁত ছোট ও ধারালো হয়, আর স্থায়ী দাঁতগুলো আকারে বড় ও চওড়া হয়।
৫. কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরু চিনুন
আজকাল কিছু অসাধু ব্যবসায়ী স্টেরয়েড বা হরমোন খাইয়ে গরুকে দ্রুত মোটাতাজা করে। এগুলো চেনার উপায়:
আঙুলের চাপ পরীক্ষা: কৃত্রিম উপায়ে মোটাতাজা করা গরুর শরীরে আঙুল দিয়ে চাপ দিলে সেই জায়গাটি দেবে যায় এবং আগের অবস্থায় ফিরতে বেশ সময় নেয়। সুস্থ গরুর মাংসপেশি শক্ত ও টানটান থাকে।
শরীরের গড়ন: স্টেরয়েড দেওয়া গরুর শরীর অস্বাভাবিক ফোলা দেখায়, বিশেষ করে পেছনের অংশ। এদের চামড়া ধরলে মনে হবে ভেতরে পানি জমে আছে।
৬. কুঁজ এবং পিঠের অংশ দেখুন
দেশি সুস্থ গরুর কুঁজ (ঘাড়ের ওপরের উঁচু অংশ) বেশ বড়, শক্ত ও টানটান থাকে।
গরু যদি কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা বা অসুস্থ হয়, তবে তার কুঁজটি নরম ও ঝুলে পড়া মনে হবে। এছাড়া গরুর পিঠের হাড় সোজা ও মজবুত কি না তা দেখে নিন।
৭. চামড়া ও পশমের উজ্জ্বলতা
সুস্থ গরুর গায়ের চামড়া টানটান এবং পশম মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাবে। গায়ের চামড়ায় হাত দিলে যদি নরম ও নমনীয় অনুভূত হয়, তবে সেটি সুস্থ গরুর লক্ষণ। চামড়ায় কোনো ক্ষত, ঘা বা উকুন-আঁঠালির উপদ্রব আছে কি না তা ভালো করে দেখে নিন।
৮. গরুর খুরের অবস্থা ও হাঁটাচলা
গরুকে হাটে কিছুটা হাঁটিয়ে দেখুন। সুস্থ গরু স্বাভাবিকভাবে চার পায়ে ভর দিয়ে হাঁটবে।
যদি কোনো গরু খুঁড়িয়ে হাঁটে, তবে তার খুরে কোনো সমস্যা বা ইনফেকশন থাকতে পারে। এছাড়া খুরের ভেতরের অংশটি পরিষ্কার এবং ফাটা বা জখমমুক্ত হওয়া জরুরি।
৯. মল-মূত্র স্বাভাবিক কি না নিশ্চিত হোন
গরু কেনার আগে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার মল-মূত্র ত্যাগের বিষয়টি খেয়াল করুন।
গরুর পাতলা পায়খানা বা ডায়রিয়া থাকলে তার লেজের গোড়ায় গোবর লেগে থাকবে। এমন গরু কেনা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি পেটের তীব্র ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে।
১০. গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা
সুস্থ গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক গতিতে চলে। যদি দেখেন কোনো গরু দ্রুত শ্বাস নিচ্ছে, পেট হাপরের মতো ওঠানামা করছে বা শ্বাস নেওয়ার সময় শব্দ হচ্ছে, তবে বুঝতে হবে গরুটির ফুসফুসে সমস্যা বা ঠাণ্ডা-জ্বর রয়েছে।
এক নজরে সুস্থ বনাম অসুস্থ গরুর পার্থক্য
| বৈশিষ্ট্য | সুস্থ গরু | অসুস্থ/কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা গরু |
| আচরণ | চঞ্চল, কান ও লেজ নাড়ায় | ঝিমায়, নড়াচড়া করতে চায় না |
| নাক ও চোখ | নাক ভেজা, চোখ উজ্জ্বল ও পরিষ্কার | নাক শুকনা, চোখ ঘোলাটে বা বসা |
| শরীরে চাপ দিলে | মাংস শক্ত, চাপ দিলে দ্রুত স্প্রিংয়ের মতো ফেরে | মাংস নরম, আঙুলের চাপ বসে যায় |
| খাবার | স্বাভাবিক ঘাস বা খড় খায়, জাবর কাটে | খাবার খেতে চায় না, জাবর কাটে না |
| শ্বাস-প্রশ্বাস | স্বাভাবিক ও শান্ত | দ্রুত এবং কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস |
কোরবানির গরু কেনার কিছু অতিরিক্ত টিপস
দিনের আলোয় গরু কিনুন: রাতের বেলা আলোর স্বল্পতার কারণে গরুর গায়ের ক্ষত, চোখের রোগ বা চামড়ার সমস্যা সহজে ধরা পড়ে না। তাই সবসময় চেষ্টা করুন বিকালের মধ্যে গরু কেনা শেষ করতে।
দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী থেকে সাবধান: হাটে সরাসরি বিক্রেতা বা খামারির কাছ থেকে গরু কেনার চেষ্টা করুন। দালালের খপ্পরে পড়লে অতিরিক্ত দাম ও ত্রুটিপূর্ণ গরু কেনার ঝুঁকি থাকে।
হাসিল ঘর নিশ্চিত করুন: গরু চূড়ান্ত করার পর হাটের নির্ধারিত হাসিল ঘরে গিয়ে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হাসিল বা রসিদ কেটে নিন। এতে পশুর মালিকানা আইনিভাবে নিশ্চিত হয়।
সঠিক নিয়ম মেনে এবং একটু সময় নিয়ে দেখেশুনে গরু কিনলে ঠকার সম্ভাবনা একবারে কমে যায়। আশা করি, ওপরের টিপসগুলো আপনার কোরবানির জন্য একটি সুস্থ ও সুন্দর পশু নির্বাচনে সাহায্য করবে।

