
রংপুর অঞ্চলে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে চলতি মৌসুমে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল জুড়ে এখন কেবল মিষ্টি কুমড়ার সমারোহ। তবে ফলন ভালো হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন প্রান্তিক চাষীরা। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়েই সংশয় দেখা দিয়েছে।
চাষাবাদের চিত্র ও লক্ষ্যমাত্রা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, অনুকূল আবহাওয়া এবং রোগবালাই কম হওয়ায় লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার চরাঞ্চলগুলোতে গত কয়েক বছরে মিষ্টি কুমড়ার চাষ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি মৌসুমে এই অঞ্চলে ১১ হাজার হেক্টর জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষ করা হয়েছে, যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লক্ষ ৪০ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদিত ফসলের প্রায় ৯২ শতাংশই উৎপাদিত হচ্ছে চরাঞ্চলে।
খরচ ও বাজার দরের অসংগতি
চাষীদের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়া চাষে খরচ হয় গড়ে ১৬ থেকে ২০ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় ফলন হয় ৬০ থেকে ৮০ মণ। গত বছর প্রতি মণ কুমড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এ বছর তা নেমে এসেছে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি কুমড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১২ টাকায়।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটিয়া চরের কৃষক তমিজ উদ্দিন জানান, তিনি ২০ বিঘা জমিতে ৩ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা খরচ করে কুমড়া চাষ করেছেন। ফলন ভালো হলেও পাইকাররা গত বছরের তুলনায় অনেক কম দাম বলছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “ফলন ভালো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে দাম পাওয়া যাচ্ছে তাতে খরচ উঠবে কিনা সন্দেহ।
রৌমারী উপজেলার আরেক কৃষক নজরুল ইসলাম গত বছরের লাভের আশায় এবার ১২ বিঘা জমিতে আবাদ বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজার দর তাঁর সেই আশায় জল ঢেলে দিয়েছে। কৃষকদের আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে কুমড়া চাষে অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে।
আলুর প্রভাব ও বাজারের অস্থিরতা
ব্যবসায়ীদের মতে, বাজারে আলুর পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং নিম্নমূল্যের কারণে মিষ্টি কুমড়ার চাহিদা কমেছে। রংপুর পৌর বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বাজারে আলু ১০-১৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আলুর দাম কম থাকলে সাধারণ মানুষ অন্যান্য সবজির বদলে আলু বেশি কেনে, যার প্রভাব পড়ে কুমড়ার বাজারে। যখন আলুর দাম বাড়ে, তখন মানুষ বিকল্প হিসেবে কুমড়া বেছে নেয় এবং কৃষকরাও ভালো দাম পায়।
রংপুর অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ প্রচুর। সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে।”
চরাঞ্চলের কৃষকদের এই সংকট মোকাবিলায় হিমাগার সুবিধা বৃদ্ধি এবং সরকারিভাবে বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে চরের এই সম্ভাবনাময় কৃষি খাতটি হুমকির মুখে পড়তে পারে।

