পাট রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি ছিল—পাটের বীজের জন্য ভারতের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা। বাৎসরিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার পাটবীজ আমদানি করতে হতো দেশে। তবে এই পরনির্ভরশীলতা কাটাতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই)। প্রতিষ্ঠানটি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ‘বিজেআরআই তোষা পাট-৯’ জাতের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাটবীজে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রদর্শনী প্লটে এই জাতটি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন চাষিরা। নতুন জাতটি থেকে ভালো মানের আঁশ পাওয়ার পাশাপাশি নিজ জমিতেই প্রয়োজনীয় পাটবীজ উৎপাদন করতে পারছেন তারা। এ বছর পাটের ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় কৃষকদের মাঝে নতুন এই জাতটি চাষে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্ভাবিত ‘তোষা পাট-৯’ যেভাবে অনন্য
বিজ্ঞানীদের মতে, স্বল্পমেয়াদি ও অধিক ফলনশীল এই নতুন জাতটির বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—মাত্র ১০০ থেকে ১১০ দিনের মধ্যে ভালো মানের বীজ সংগ্রহ সম্ভব হওয়া, প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩ দশমিক ২৫ টন আঁশ উৎপাদন, গোড়া পচা রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম হওয়া। জলাবদ্ধ মাটি বা পরিত্যক্ত জমিতেও এ পাট ভালো জন্মায়। স্বল্প জীবনকাল হওয়ায় একই জমিতে বছরে ৩ থেকে ৪টি ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
দিনাজপুরের নশিপুর এলাকায় অবস্থিত পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রে ১০ একর জমিতে এই জাতের প্রজনন বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদিত এসব বীজ বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের (বিএডিসি) কাছে হস্তান্তর করা হবে। বিএডিসি নিজস্ব জমিতে এসব বীজ আবাদ করে আরও বেশি পরিমাণে বীজ উৎপাদন করবে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারা দেশে বিতরণ করবে। এছাড়া জেলার ৪৫ জন কৃষককে এই বীজের প্রদর্শনী প্লট দেওয়া হয়েছে।
চিরিরবন্দরের কৃষক সেকেন্দার আলী জানান, নতুন জাতটি লম্বা ও সতেজ হওয়ায় যেমন ভালো আঁশ পাওয়া যায়, তেমনি পরবর্তী মৌসুমের জন্য নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। পাট পচানোর জায়গার সংকট থাকলেও ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকরা এখন কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে পাট পচাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। একই এলাকার আরেক কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আগে দোকান থেকে বীজ কিনে আবাদ করলেও ভালো ফলন পেতাম না। গত বছর এক একর জমিতে প্রদর্শনী প্লটে এই জাতটি চাষ করে প্রায় ৩০ মণ পাট পেয়েছি। প্রতি মণ ৪,২০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।’
বীজ আমদানিমুক্ত বাংলাদেশের রোডম্যাপ
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. নার্গীস আক্তার জানান, দেশে বার্ষিক পাটবীজের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টন। বর্তমানে প্রজনন বীজ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই প্রজনন বীজ বিএডিসির মাধ্যমে সারা দেশের কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানান, পাটকে পুনরায় ‘সোনালি আঁশ’–এর গৌরবে ফিরিয়ে আনতে ২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য বিদেশি বীজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের লাভবান করা ও পরিবেশবান্ধব পাটের উৎপাদন বাড়ানো।
চিরিরবন্দরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুভাষীষ অধিকারী বলেন, ‘এ বছর পাটের দাম ভালো থাকায় কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে। তোষা পাট-৯ জাতটি খুবই ভালো এবং সহজলভ্যভাবে কৃষকরা এই বীজ পাচ্ছেন। এই জাতটিতে নিড়ানি কম লাগে এবং পতিত জমিতেও ফলন ভালো পাওয়া যায়। পাটের পাশাপাশি যারা বীজ উৎপাদন করছেন, তারাও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেলে কৃত্রিম জলাশয় তৈরি করে পাট পচানোর ব্যবস্থা নিজেরাই করবেন।’
দিনাজপুর পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রের জেএফএ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘দিনাজপুর অঞ্চলে পাটচাষিদের বীজের ঘাটতি রয়েছে। তোষা পাট-৯-এর জীবনকাল ১০০ দিন এবং ফলন ভালো হওয়ায় এই ঘাটতি পূরণে আমরা ৪৫ জন কৃষকের মাধ্যমে বীজ উৎপাদন করেছি। কৃষকরা নিজেরাই বীজ উৎপাদন করায় তাদের নিজস্ব চাহিদা মিটবে এবং উদ্বৃত্ত বীজ অন্যান্য কৃষকদের ঘাটতি পূরণ করবে।’
দিনাজপুর পাটবীজ উৎপাদন ও গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তানছির বিল্লাহ বলেন, ‘নতুন তোষা পাট-৯ জাতটি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ায় এটি মাঠপর্যায়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কৃষকদের প্রদর্শনী প্লটের ফলাফল অত্যন্ত ভালো। পাটের ন্যায্যমূল্য ও পচানোর সময় কমাতে পারলে কৃষকরা আরও আগ্রহী হবেন। এবার প্রচুর পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। পাট পচানোর জন্য জলাশয়ের অভাব পূরণে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ চলছে। মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।’

