
স্ট্রবেরি বর্তমানে বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল। সঠিক পরিকল্পনা এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করলে মাঠ পর্যায়ের একজন কৃষক অল্প সময়ে বেশ ভালো মুনাফা অর্জন করতে পারেন।
নিচে স্ট্রবেরি চাষের সফল কলাকৌশলগুলো সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
১. সঠিক জাত ও সময় নির্বাচন
সফলতার প্রথম ধাপ হলো আপনার এলাকার জলবায়ুর উপযোগী জাত বাছাই করা।
উন্নত জাত: বারি স্ট্রবেরি-১, ২ ও ৩ এবং রাবি স্ট্রবেরি-১, ২ ও ৩ আমাদের দেশের আবহাওয়ায় ভালো ফলন দেয়।
সময়: আশ্বিন মাসের শেষ থেকে কার্তিক মাস (অক্টোবর-নভেম্বর) চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে নভেম্বর মাস পর্যন্ত চারা রোপণ করা যায়।
২. জমি ও মাটি প্রস্তুতি
স্ট্রবেরি চাষের জন্য উঁচু ও সুনিষ্কাশিত জমি বেছে নিন।
মাটি: বেলে-দোআঁশ মাটি স্ট্রবেরির জন্য সবচেয়ে ভালো। মাটিতে প্রচুর জৈব সার থাকা প্রয়োজন।
জমি চাষ: জমিকে ৪-৫টি আড়াআড়ি চাষ দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে।
বেড তৈরি: ৩০ সেমি উঁচু এবং ২-৩ ফুট চওড়া বেড তৈরি করুন। দুই বেডের মাঝে ১ ফুট নালা রাখুন যা সেচ ও পানি নিষ্কাশনে সাহায্য করবে।
৩. সার ব্যবস্থাপনা
ভালো ফলনের জন্য সুষম সারের কোনো বিকল্প নেই। এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমির জন্য আনুমানিক পরিমাণ:
পচা গোবর: ২-৩ টন
টিএসপি: ৩০-৩৫ কেজি
এমওপি: ২৫-৩০ কেজি
ইউরিয়া: ২০-২৫ কেজি (এটি চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর থেকে কিস্তিতে দিতে হয়)
জিপসাম: ১০-১২ কেজি
টিপস: জমি প্রস্তুতির সময় গোবর, টিএসপি এবং জিপসাম মিশিয়ে দিন। ইউরিয়া এবং পটাশ সার চারা রোপণের পর উপরি প্রয়োগ হিসেবে ব্যবহার করা ভালো।
৪. আধুনিক চাষ পদ্ধতি (মালচিং)
স্ট্রবেরি চাষে ‘মালচিং’ পদ্ধতি ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক বললেই চলে। এতে ফল সরাসরি মাটির সংস্পর্শে আসে না এবং পচে যায় না।
কালো পলিথিন: বেডের উপর কালো পলিথিন বিছিয়ে দিন। নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর পলিথিন ফুটো করে চারা লাগান।
খড়: পলিথিন না থাকলে শুকনো খড় বা নাড়া ব্যবহার করা যেতে পারে।
৫. চারা রোপণ ও সেচ
দূরত্ব: চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ১ ফুট এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ১.৫ ফুট।
সেচ: স্ট্রবেরি গাছে পরিমিত পানি প্রয়োজন। অতিরিক্ত পানি জমলে গোড়া পচে যেতে পারে, আবার পানির অভাব হলে ফল ছোট হয়ে যায়। বিকেলে হালকা সেচ দেওয়া সবচেয়ে ভালো।
৬. পরিচর্যা ও রোগ দমন
অপ্রয়োজনীয় রানার কাটা: চারা থেকে অনেক লম্বা লতা (রানার) বের হয়। ফল নেওয়ার জন্য এই রানারগুলো কেটে ফেলতে হবে, নয়তো ফলের আকার ছোট হয়ে যাবে।
পাখি থেকে সুরক্ষা: ফল পাকার সময় পাখির উপদ্রব বাড়ে। এজন্য পুরো ক্ষেত নেট বা জাল দিয়ে ঢেকে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
ফল পচা রোগ: ছত্রাকের আক্রমণে ফল পচে যেতে পারে। লক্ষণ দেখা দিলে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক (যেমন: ডাইথেন এম-৪৫) স্প্রে করুন।
৭. ফল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ
ফল যখন লালচে বর্ণ ধারণ করবে তখন সংগ্রহ করতে হবে।
স্ট্রবেরি অত্যন্ত পচনশীল। তাই সংগ্রহের পর প্লাস্টিকের ছোট বক্সে প্যাকিং করে দ্রুত বাজারে পাঠাতে হবে।
স্ট্রবেরি চাষে সফল হতে হলে সবসময় ক্ষেত পরিষ্কার রাখুন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করুন। মনে রাখবেন, স্ট্রবেরি গাছের গোড়ায় সরাসরি পানি দেবেন না, সবসময় দুই বেডের মাঝের নালা দিয়ে পানি সেচ দেবেন।

