
হাওর অঞ্চলে বোরো ধানের দাম আবারও কমেছে। মাঝে মাঝে বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ায় কাটা ধান ঠিকমতো শুকানো সম্ভব না হওয়ায় এ দুর্দশা তৈরি হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, ধান ভেজা অবস্থায় অঙ্কুরিত হয়ে যাচ্ছে, যা বাজারে বিক্রির অনুপযুক্ত। ফলে ন্যায্যমূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা; অনেক সময় উৎপাদন খরচও উঠছে না।
বাংলাদেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো মৌসুমে (ডিসেম্বর-এপ্রিল)।
সরকার এগিয়ে এনেছে ধান সংগ্রহ
সংকট কমাতে সরকার ৬টি হাওর জেলায় বোরো ধান সংগ্রহ ১২ দিন আগেই শুরু করেছে। জেলাগুলো হলো- সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ। পাশাপাশি সারা দেশে আগের সময়সূচি অনুযায়ী ধান সংগ্রহ চালু থাকবে।
কিন্তু বৃষ্টির কারণে মজুত করতে না পেরে অনেক কৃষক ইতোমধ্যেই মিলার ও ব্যবসায়ীদের কাছে অনেক কম দামে ধান বিক্রি করে দিয়েছেন।
দাম কমছে অর্ধেকেরও বেশি
কৃষকদের মতে মৌসুমের শুরুর দিকে যেখানে ধানের দাম ছিল ৭৫০–১১০০ টাকা (প্রতি মণ), সেখানে এখন নেমে এসেছে ৬০০ টাকায় – যা উৎপাদন খরচের প্রায় অর্ধেক।
নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার বিধান সরকার জানান, শুরুতে ৭৫০ টাকায় বিক্রি করলেও গতকাল দাম পড়েছে ৬০০ টাকায়। “পর্যাপ্ত রোদ না থাকায় ধান ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না, তাই দাম আরও কমেছে।” একই চিত্র বড়হাট্টা উপজেলার বাজারেও।
ফকিরের বাজারের কৃষক রনী মিয়া বলেন, “মিলার ও ব্যবসায়ীরা প্রতি মণ ধান কিনতে ৬০০ টাকা দিচ্ছে। মাত্র কয়েকদিন আগে ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি। ভেজা ধান কেউ কিনতে চায় না।”
ধান ব্যবসায়ী খোকন মিয়া জানান, “ভেজা ধান মজুত করলে তা অঙ্কুরিত হয়ে যায়। আমরা ৬০০-৬৫০ টাকায় কিনেছি, কিন্তু লোকসান হয়েছে। রোদ উঠলে আবার কিনব।”
নেত্রকোনায় প্লাবিত ১৩ হাজার হেক্টর জমি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত উপপরিচালক রকিবুল হাসান বলেন, হাওরে ৮ হাজার ১৯০ হেক্টর ও অ-হাওর এলাকায় ৫ হাজার ২৭৬ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে, যা জেলার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। তার মতে, এর ফলে ৮০ হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জে ৭ হাজার হেক্টর ডুবো
মিঠামইনের কৃষক আলিম উদ্দিন বলেন, “এপ্রিলের মাঝামাঝি ৭৫০-৮০০ টাকায় ধান বিক্রি করেছি। মাত্র পাঁচ দিন আগে বিক্রি করতে হয়েছে ৭০০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বললেন, রং নষ্ট হয়ে গেছে, তাই দাম কম।”
ইটনা উপজেলার আশরাফুল ইসলাম তিনদিন আগে ১০০ মণ ধান বিক্রি করতে হিমশিম খান। “ব্যবসায়ীরা ৬০০ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। ১০টি বাজার ঘুরে ৬৫০ টাকায় বিক্রি করি। কিন্তু আমার উৎপাদন খরচ ১২০০ টাকার বেশি।”
কিশোরগঞ্জের ডিএই’র উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান জানান, সকাল থেকে বৃষ্টিতে নদী ও বন্যার পানি বেড়ে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর হাওরের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে ২১ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
হবিগঞ্জে পচছে কাটা ধান
বানিয়াচংয়ের কৃষক আজিজুল ইসলাম বলেন, “মেঘলা আবহাওয়ায় কাটা ধান পচে যাচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ১ হাজার থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন ৬০০ টাকায় বাধ্য হয়ে বিক্রি করছি।”
হবিগঞ্জ ডিএই’র অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার বিশ্বাস জানান, ১১ হাজার ৩০০ হেক্টর পাকা ধানের জমি তলিয়ে গেছে এবং ২ মে পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আবহাওয়া সতর্কতা
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল বেলা ১টা থেকে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। অস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি এলাকায় ধসের আশঙ্কা রয়েছে।
বোরো উৎপাদন ও সরকারি ক্রয়
গত অর্থবছরে বোরো উৎপাদন ২.১৩ কোটি টন থেকে এ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২.২৪ কোটি টন। বোরো আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০.৫০ লাখ হেক্টর (৩.২৯% বৃদ্ধি)।
উৎপাদন খরচ ও আবহাওয়ার ক্ষতি সত্ত্বেও ২২ এপ্রিল সরকার ঘোষণা দেয় ধানের ক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত থাকবে। চলতি মৌসুমে খাদ্য মন্ত্রণালয় ৫ লাখ টন ধান কিনবে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে – যা উৎপাদনের তুলনায় নগণ্য।
প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬’ উদ্বোধন শেষে হাওর পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের কৃষিমন্ত্রী মো. আমিন উর রশিদ বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ে ঘোষণা দিয়ে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ করা হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেনা গেলে তারা ৩০ শতাংশ বেশি মূল্য পাবেন।” তীব্র ক্ষতিগ্রস্ত হাওর কৃষকদের জন্য তিন মাসের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

