Thursday, 30 April, 2026

ভাইরাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষে ব্যাপক লোকসান, ক্ষতির মুখে কৃষক


ভাইরাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষে ব্যাপক লোকসান, ক্ষতির মুখে কৃষক

চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলায় তরমুজ চাষে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় ও আগত কৃষকেরা। ভাইরাসের আক্রমণ, প্রতিকূল আবহাওয়া, ফলন কমে যাওয়া ও বাজারদর পতনের জেরে চাষিরা মূলধন হারানোর পাশাপাশি ঋণের বোঝা নিয়েও পড়েছেন বিপাকে।

উপজেলার ধুম ইউনিয়নের বাসিন্দা নাজমুল আলম এ বছর প্রথমবার দেড় একর জমিতে তরমুজ চাষ করেন। খরচ হয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু ভাইরাসের সংক্রমণে সব গাছ নষ্ট হয়ে গেলে তিনি একটি তরমুজও বিক্রি করতে পারেননি। নাজমুল আলম বলেন, “লাভ তো দূরের কথা, ১ টাকাও পুঁজি তুলতে পারিনি। এবার ভালো ফসল হতো আশা ছিল, কিন্তু প্রকৃতি ও রোগের কারণে সব শেষ।”

শুধু নাজমুল আলম নন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শতাধিক তরমুজ চাষি একই দশার শিকার হয়েছেন। বিনিয়োগের তুলনায় আয় একেবারেই নগণ্য হওয়ায় তাদের লোকসানের পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে কৃষক ও কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।

আরো পড়ুন
বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসল রক্ষায় কৃষকের করণীয়: একটি জরুরি নির্দেশিকা
বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ফসল রক্ষায় কৃষকের করণীয়: একটি জরুরি নির্দেশিকা

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের হাত নেই, কিন্তু সঠিক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে Read more

লবণাক্ত মুরুভূমিতে ভূট্রা ও ধান চাষ: শ্যামনগরে কৃষিতে বিপ্লব
শ্যামনগরে কৃষিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন শিলা ও রুহুল

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় লবণাক্ত ধূসর জমিতে এখন সবুজের সমারোহ। যেখানে নোনা পানির দাপটে বছরের অধিকাংশ সময় জমি পতিত পড়ে Read more

কোটি টাকার বিনিয়োগ, হাতেগোনা আয়

উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে মিরসরাইয়ে প্রায় ৭৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। হিঙ্গুলী, ধুম, ওচমানপুর, ইছাখালী, দুর্গাপুর, মিঠানালা, মঘাদিয়া, মায়ানী, সাহেরখালী ইউনিয়নে গ্লোরি জাম্বু, বেঙ্গল কিং, ড্রাগন কিং ও গ্রিন ড্রাগন জাতের তরমুজ চাষ করা হয়। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলা থেকে আসা অনেক কৃষক স্থানীয় জমি ইজারা নিয়ে চাষ শুরু করলেও তাদের দেখাদেখি স্থানীয় কৃষকরাও বিপুল বিনিয়োগে জড়িয়ে পড়েন।

কাটাছরা ইউনিয়নের চাষি মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, “আমিসহ ৫ জন মিলে ১০ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। খরচ হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। অথচ বিক্রি করতে পেরেছি মাত্র ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। লোকসান হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।” তিনি জানান, ধার-দেনা করে প্রথমবার তরমুজ চাষ করেছিলেন। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ফলন কমে যায়। আর যা হয়েছিল, বৃষ্টিতে তা পচে নষ্ট হয়ে যায়।

কৃষকেরা জানান, প্রতিজন শেয়ারদার ৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। এসব অর্থের বড় অংশ ব্যাংক, এনজিও ও স্বজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জোগাড় করতে হয়েছে। ভাইরাস, ফলন কমে যাওয়া, দাম পড়ে যাওয়া এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তরমুজ মাঠ থেকে বাজারে তুলতে না পারায় আশানুরূপ মূল্য পাননি তারা।

বৈরি আবহাওয়া ও ভাইরাসের দ্বৈত সংকট

ধুম ইউনিয়নের নাজমুল আলম আরও বলেন, “দিনের প্রচণ্ড গরম এবং রাতে কুয়াশা—দুই মিলে গাছ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। ফলন কিছুই হয়নি। অথচ প্রতি বছর এই জমিতে ফেলন বা সরিষা চাষ করে ভালো ফলন পেতাম। এবার তিনিই সর্বনাশ করেছেন।”

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পরিবহন সুবিধা বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা নিশ্চিত না করা গেলে তরমুজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন চাষিরা। ভবিষ্যতে এ খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করছেন তারা।

কৃষি কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় গণমাধ্যমকে বলেন, “অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর মিরসরাইয়ে তরমুজের আবাদ বেড়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কৃষকেরা এখানে জমি ইজারা নিয়ে চাষ করেছেন, স্থানীয় কৃষকরাও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। ভাইরাস আক্রমণ ও ভারী বৃষ্টির কারণে জমিতে পানি জমে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। যেসব জমিতে তরমুজ এখনও ভালো অবস্থায় আছে, দ্রুত সেগুলো বাজারজাত করতে পারলে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল।”

উল্লেখ্য, মিরসরাইয়ের তরমুজ চাষিরা এখন কীভাবে ঋণের বোঝা সামলাবেন—সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে তাগিদ দিচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার।

0 comments on “ভাইরাস ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষে ব্যাপক লোকসান, ক্ষতির মুখে কৃষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ