Tuesday, 06 October, 2026

বাংলাদেশে আমের মৌসুমে ‘কেমিক্যাল আতঙ্ক’: বিজ্ঞান না ভীতি?


বাংলাদেশে এখন আমের মৌসুম চলছে। মাঠে মাঠে গাছভরা পাকা আম—কৃষকের চোখেমুখে স্বপ্ন দেখার সময় এখনই। সারা বছরের পরিশ্রমের ফল ঘরে তুলে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার এটাই সুযোগ। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে একটি বিষয় সেই স্বস্তিতে ছায়া ফেলছে—‘কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আম’ নিয়ে আতঙ্ক, আর সেই আতঙ্কের জেরে নির্বিচারে ফল ধ্বংসের ঘটনা।

সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় প্রশাসন রাসায়নিক ব্যবহারের অভিযোগে প্রায় ৮,৫০০ কেজি আম ধ্বংস করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ধ্বংস কতটা বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে? তা কি ন্যায়সঙ্গত ছিল?

প্রসঙ্গত, বিশ্বজুড়ে কিছু নির্ধারিত রাসায়নিক ফল পাকানোর জন্য ব্যবহারের অনুমতি পায়। যেমন—ইথোফন (Ethephon), যা একটি উদ্ভিদ বৃদ্ধিবর্ধক হরমোন। এটি এমনভাবে তৈরি, যা নির্ধারিত মাত্রায় ব্যবহৃত হলে ফলকে দ্রুত ও অভিন্নভাবে পাকতে সহায়তা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), FAO এবং কোডেক্স অ্যালিমেন্টেরিয়াস কমিশনের মতে, এটি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে নিরাপদ।

আরো পড়ুন
প্রাকৃতিক মহৌষধ: কালোজিরা, রসুন ও মধু একসাথে খেলে কী হয়?
কালোজিরা, রসুন ও মধু একসাথে খেলে কী হয়? জানুন জাদুকরী স্বাস্থ্য উপকারিতা

আমাদের দৈনন্দিন রান্নাঘরে এমন কিছু ভেষজ উপাদান রয়েছে, যা স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর মধ্যে অন্যতম তিনটি Read more

আগামীকাল মধ্যরাত থেকে মেঘনায় ২২ দিনের জন্য ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ
আগামীকাল মধ্যরাত থেকে মেঘনায় ২২ দিন মাছ ধরা নিষিদ্ধ: ৪২ হাজার জেলে পাবেন ভিজিএফ চাল

ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা সংরক্ষণে আগামীকাল বুধবার মধ্যরাত থেকে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনা নদীতে সব Read more

বাংলাদেশে ইথোফনের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২.০ মিলিগ্রাম/কেজি। এটি সাধারণত ফলের বাইরের খোসায় সীমাবদ্ধ থাকে, পানিতে সহজে মিশে যায়, এবং ধুয়ে বা খোসা ফেলে দিলে এর সম্ভাব্য ক্ষতি কার্যত থাকে না। পরীক্ষাগারে অনেক সময়ই ফলের ভেতরের অংশে ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিক অবশিষ্ট পাওয়া যায় না।

তবুও কেবল ‘কেমিক্যাল’ শব্দ শুনে ফল ধ্বংসের সিদ্ধান্ত অনেক সময় অজ্ঞতা ও আতঙ্ক থেকেই আসে। অথচ ‘কেমিক্যাল’ মানেই ক্ষতিকর নয়। কোন রাসায়নিকটি ব্যবহৃত হয়েছে, কতটা পরিমাণে, তা মানবদেহের জন্য নিরাপদ কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের আলোয় খুঁজতে হয়।

সুতরাং, শুধু সন্দেহের বশে ফল ধ্বংস না করে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া দরকার:

বৈজ্ঞানিক যাচাই ছাড়া ধ্বংস নয়: প্রতিটি জব্দকৃত আম ল্যাব টেস্টে পাঠিয়ে তবেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপদ মাত্রায় ইথোফন থাকলে বাজারজাতের অনুমতি: কৃষকের পরিশ্রম যেন অযথা নষ্ট না হয়।
অযোগ্য ফলের বিকল্প ব্যবহার: ফল ধ্বংস না করে তা আচার, পশুখাদ্য বা জৈবসারে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপদ ফল পাকানো চেম্বার স্থাপন: সরকারিভাবে প্রতিটি জেলায় ফল পাকানোর চেম্বার তৈরি করা যেতে পারে।
জনগণের সচেতনতা বাড়ানো: বিজ্ঞানের আলোয় তথ্যভিত্তিক প্রচারণাই পারে কেমিক্যাল আতঙ্ক দূর করতে।

আমাদের প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, তথ্যনির্ভর সচেতনতা। প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও গণমাধ্যম—সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে যেন একটি মানবিক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং কৃষকবান্ধব খাদ্যনীতি গড়ে ওঠে।

0 comments on “বাংলাদেশে আমের মৌসুমে ‘কেমিক্যাল আতঙ্ক’: বিজ্ঞান না ভীতি?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ