Sunday, 15 March, 2026

উত্তরাঞ্চলে অতি বর্ষণে তলিয়ে গেছে আলুক্ষেত, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি


অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্থ আলু চাষি

টানা বর্ষণে উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলার রবিশস্য, বিশেষ করে আলুক্ষেতগুলো প্লাবিত হয়ে গেছে। এরই মধ্যে বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষকেরা লোকসানে পড়েছেন। তার ওপর আকস্মিক এই বন্যায় তাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

গত বুধ ও বৃহস্পতিবার রাতের ভারী বর্ষণে প্লাবিত হয় এসব জেলার ফসলি জমি। শুক্রবার গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ, জয়পুরহাটের কালাই ও বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, অসংখ্য আলুক্ষেত ডুবে গেছে। অনেক জমি পুরোপুরি তলিয়ে গেছে । কাদা ও পানি জমে থাকা ক্ষেত থেকে আলু তুলতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি, ক্ষেতলাল ও কালাই এবং বগুড়ার শিবগঞ্জের কৃষকরা ।

আরো পড়ুন
রংপুরে কমছে ৩,৪৮৪ হেক্টর আবাদি জমি, বাড়ছে খাদ্য চাহিদা
বড় ব্যবসায়ীরা প্রণোদনা পেলেও কৃষকদের বেলাতেই বাধা: কৃষি উপদেষ্টা

কৃষিপ্রধান রংপুর অঞ্চলে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ। বাড়ি নির্মাণ, শিল্পকারখানা, ইটভাটা ও অন্যান্য স্থাপনা স্থাপনের ফলে Read more

রংপুরে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন, ন্যায্য দাম না পেয়ে চাষিদের হতাশা
রংপুরে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন

রংপুর অঞ্চলে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলে চলতি মৌসুমে মিষ্টি কুমড়ার বাম্পার ফলন হয়েছে। বিস্তীর্ণ Read more

উপজেলাভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জয়পুরহাট সূত্রে জানা গেছে, আকস্মিক এ বর্ষণ ও কালবৈশাখী ঝড়ে জেলাটির ১৪১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ হেক্টর আলু, ১৩ হেক্টর শাকসবজি, পাঁচ হেক্টর ধান, ২৩ হেক্টর গম ও ১০ হেক্টর ভুট্টার জমি রয়েছে ।

কালাই উপজেলার দূদাল গ্রামের কৃষক মো. মোমিন জানান, গত দুই দিনের টানা বর্ষণে তার এক একর জমির আলু পুরোপুরি ডুবে গেছে। তার গ্রামে অন্তত ১০০ একর জমির একই অবস্থা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন এসব আলু আমি বাড়িতেও রাখতে পারছি না, হিমাগারেও দিতে পারছি না। ফলে অতি কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হব’ ।

একই উপজেলার উদয়পুর গ্রামের কৃষক শাহজালালের প্রায় দুই একর জমির আলু এখন পানির নিচে। তিনি বলেন, ‘সময়মতো শ্রমিক পাইনি বলে তুলতে পারিনি। প্রতি ডেসিমালে ১২০০ টাকা খরচ হয়েছে। ভালো আলুও বিক্রি হচ্ছে না; এই পানি-পচা আলু নিয়ে এখন কোথায় যাব, কে কিনবে?’

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের রাজোষ গ্রামের কৃষক ফিরোজ কবির জানান, এলাকার সব হিমাগার ভরে গেছে, তাই মাঠে রেখে দিয়েছিলেন জমি থেকে তোলা আলু। হঠাৎ বৃষ্টিতে তার দেড় একর জমির সব আলু তলিয়ে গেছে ।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান জানান, দেরিতে আলু তোলা কৃষকদের প্রায় পাঁচ হেক্টর জমি এ বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ।

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক বাজারের কৃষক আব্দুল গফফার জানান, বীজ সংরক্ষণের জন্য দুই বিঘা জমির আলু তোলেননি। এত বৃষ্টি হবে ভাবতে পারেননি। এখন তার জমিতে হাঁটু পানি। চারপাশ প্লাবিত হওয়ায় পানি সরানোরও উপায় নেই ।

বগুড়া ডিএইর উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন জানান, দুই দিনের বৃষ্টিতে শিবগঞ্জে ৩০ হেক্টর আলুক্ষেত ডুবে গেছে। এছাড়া ১০ হেক্টর সবজি ও আট হেক্টর কলাবাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ।

ঠাকুরগাঁও ও রংপুরে ক্ষতির মুখে কৃষক

ঠাকুরগাঁও জেলার বহু কৃষকও এ অতি বর্ষণের শিকার হয়েছেন। ডিএই কর্মকর্তারা জানান, জেলাটিতে প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমির আলু এখনও তোলা হয়নি । কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, বৃষ্টির পর যদি প্রখর রোদ ওঠে, মাটির তাপে আলু আরও নষ্ট হয়ে যেতে পারে ।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ইয়াকুবপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম জানান, ছয় একর জমিতে আলু চাষে তার খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এর মধ্যে দেড় একরের আলু তুলেছেন, বাকি জমিতে পানি জমে আছে। ফলে আলু নষ্ট বা পচে যাওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন তিনি ।

টানা তিন দিনের ভারী বর্ষণে রংপুরের বিভিন্ন এলাকার আলুক্ষেতও প্লাবিত হয়েছে, বাড়ছে কৃষকের দুশ্চিন্তা ।

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধ থেকে শুক্রবার এই তিন দিনে জেলায় প্রায় ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ।

তারাগঞ্জ উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন জানান, গত বছর আলু চাষে তার প্রায় দুই লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এ মৌসুমে দুই একর জমিতে আলু চাষ করেন। বৃহস্পতিবার আলু তোলার কথা থাকলেও বুধ ও বৃহস্পতিবারের বৃষ্টিতে তার পুরো জমি তলিয়ে গেছে ।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ

আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, আগামী ১৭ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলায় কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।

রংপুর আঞ্চলিক ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, জমিতে জমে থাকা পানি অস্থায়ী; সময়মতো তা নেমে যাবে। তবে আগামী দুই-তিন দিন বৃষ্টি হলে ফসলের কিছু ক্ষতি হতে পারে ।

জয়পুরহাট ডিএইর উপ-পরিচালক সাদিকুল ইসলাম জানান, বাজারে দাম কম থাকায় অনেক কৃষক আলু তোলায় দেরি করেছিলেন। তাদের বারবার তাড়াতাড়ি তুলে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এখন ক্ষতিগ্রস্ত জমির কৃষকদের দ্রুত আলু তোলার জন্য বলা হচ্ছে, কারণ দুই-তিন দিন পানিতে ডুবে থাকলে আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল ।

0 comments on “উত্তরাঞ্চলে অতি বর্ষণে তলিয়ে গেছে আলুক্ষেত, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ