Thursday, 01 October, 2026

হাওরাঞ্চলে পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা: প্রয়োজন ন্যায্যমূল্য


নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল একসময় পাটের জন্য বিখ্যাত ছিল। এখানকার উর্বর জমিতে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপাদিত হতো, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। বড় বড় লঞ্চ-স্টিমারে করে এসব পাট দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই সোনালি আঁশের আবাদ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। কৃষকরা ধান, সবজি এবং অন্যান্য লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়ায় পাটের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

হাওরাঞ্চলের পাটের সোনালি অতীত

একসময় নেত্রকোনার অর্থনৈতিক প্রসার পাটের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। পাটের ফলন এতটাই ভালো ছিল যে শত বছর আগে একটি নদীর নামই ছিল ‘পাটেশ্বরী’। এই নদী দিয়ে নৌকা বোঝাই হয়ে পাট এবং ধান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে যেত। পরিবেশকর্মীরা মনে করেন, প্লাস্টিক পণ্যের আগ্রাসন এই ঐতিহ্যবাহী ও লাভজনক ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এর ফলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, পরিবেশ এবং মানবসম্পদও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আরো পড়ুন
পুষ্টিগুণে অনন্য ‘ব্রকলি’: সঠিক চাষ পদ্ধতি ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ব্রকলি চাষের সঠিক ও আধুনিক পদ্ধতি

বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার নাম ‘ব্রকলি’। দেখতে সবুজ ফুলকপির মতো এই সবজিটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং সুস্বাদু। একসময় ব্রকলি কেবল Read more

তীব্র সার সংকট, পথ অবরোধ, তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের চরে রেকর্ড আগাম চাষাবাদ

চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে প্রধান প্রধান নদ-নদীতে বড় ধরনের কোনো বন্যা না হওয়ায় চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়নি। Read more

কৃষকদের কণ্ঠে হতাশার সুর

মদন উপজেলার হাঁসকুড়ি গ্রামের কৃষক মো. শরীফ জানান, তিনি একসময় ৩০-৪০ কাঠা জমিতে পাট চাষ করতেন। কিন্তু বর্তমানে লাভের মুখ দেখতে না পেয়ে মাত্র ১০ কাঠা জমিতে পাট চাষ করছেন। তিনি বলেন, “জমিটা পড়ে থাকবে তাই নিজেদের ব্যবহারের জন্য কিছু পাট চাষ করি। কিন্তু বাজারে নিয়ে গেলে প্রক্রিয়াজাত করার খরচটুকুও ওঠে না।” পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াই কৃষকদের পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রধান কারণ।

পাটের আবাদ কমে যাওয়ার কারণ ও সম্ভাবনা

নেত্রকোনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, এ বছর ৪ হাজার ৫৯০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও অর্জিত হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪১০ হেক্টর। কৃষকদের মতে, পাট চাষে খরচ এবং পরিশ্রম দুটোই বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় তারা ন্যায্য দাম পান না।

তবে পরিবেশবিদ ও গবেষকরা মনে করেন, এই অবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব। গবেষক অহিদুর রহমান মনে করেন, সরকার যদি পরিবেশবান্ধব পাট উৎপাদন ও ব্যবহারে নজর দেয়, তাহলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নতি আবারও সম্ভব। পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা গেলে আবারও পাটের আবাদ বাড়ানো সম্ভব। এছাড়া, পাটজাত পণ্য তৈরির কল-কারখানা গড়ে উঠলে বাজারমূল্য বাড়বে এবং কৃষকরাও পাট চাষে নতুন করে আগ্রহী হবেন।

0 comments on “হাওরাঞ্চলে পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষিরা: প্রয়োজন ন্যায্যমূল্য”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ