Saturday, 03 October, 2026

ধানের বীজতলা পচে নিঃস্ব কৃষক: দ্বিগুণ দামে কেনা চারায় বাড়ছে উৎপাদন খরচ


“দশ শতক জমিত বেচন ছিটাছিনু, ঝড়ির পানিত তাক তলি যায়্যা পচি গ্যাছে। এ্যাখোন ৩ বিগা জমিত আমোন ধান নাগামু, এ্যাই জন্যে হাটোত বেচন কিনবার আছছি। সাড়ে সাত’শ ট্যাকা করি দশপন বেচন সাড়ে সাত হাজার ট্যাকা দিয়্যা কিননু। ইজাদদারের নোক টোল নিলো দুই’শ ট্যাকা। এ্যাগলা এ্যাখোন ভ্যানোত করি বাড়িত নিয়্যা যাবার ভাড়া, জমি হাল-চাষের খরচা, বেচন নাগাবার কামলার দাম, সার-ওষুদ কেনার ট্যাকা, নিরানি কামলা খরচা… শোগশুদ্ধা এ্যাবার যে খরচ হবে, আমোন ধান বেচি তাক উঠপার নয়।”

আরো পড়ুন
পুষ্টিগুণে অনন্য ‘ব্রকলি’: সঠিক চাষ পদ্ধতি ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ব্রকলি চাষের সঠিক ও আধুনিক পদ্ধতি

বাংলাদেশের কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার নাম ‘ব্রকলি’। দেখতে সবুজ ফুলকপির মতো এই সবজিটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং সুস্বাদু। একসময় ব্রকলি কেবল Read more

তীব্র সার সংকট, পথ অবরোধ, তিস্তা-ব্রহ্মপুত্রের চরে রেকর্ড আগাম চাষাবাদ

চলতি বছর রংপুর অঞ্চলে প্রধান প্রধান নদ-নদীতে বড় ধরনের কোনো বন্যা না হওয়ায় চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়নি। Read more

কণ্ঠজুড়ে চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ রেখে আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হাবিবুল্লাহপুর গ্রামের বর্গাচাষী রাঙ্গা মোল্লা (৫৫)। গত শনিবার সাদুল্লাপুর হাটে বাড়তি দামে ধানের চারা (বীজ) কিনতে এসে নিজের বুকফাটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

টানা কয়েকদিনের ভারী বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে গাইবান্ধা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার আমন ধানের বীজতলা পানির নিচে তলিয়ে পচে গেছে। ফলে মৌসুমে ধান রোপণ বজায় রাখতে হাটে হাটে চারা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন হাজারো কৃষক। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হাটে ধানের চারা বিক্রি হচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ দামে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচে।

অসময়ের দুর্যোগ ও কৃত্রিম জলবদ্ধতা: খাল দখলের দাপট

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ়ের শেষ পর্যন্ত আমন ধানের বীজতলা তৈরি করা হয়। শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলে ধানের চারা রোপণ কার্যক্রম।

চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার জন্য জেলায় ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি করেন কৃষকেরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরকারি তথ্যমতে, টানা বৃষ্টিতে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে ৩৩.৫ হেক্টর পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। তবে কৃষক ও স্থানীয়দের দাবি, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এই পরিসংখ্যানের চেয়ে বহুগুণ বেশি।

পানি না সরার পেছনে মূল কারণসমূহ:

  • সরকারি খালের অবৈধ দখল: কৃষকদের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক খাল-বিল ও নালাগুলো প্রভাবশালীরা দখল করে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে।

  • সড়ক ও কালভার্টের মুখ বন্ধ: উম্মুক্ত সরকারি জলাশয়ে অবাধে মাছ চাষ করা হচ্ছে এবং সড়ক-হাইওয়ের ব্রিজ-কালভার্টের মুখ মাটি ও ইমারত দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

  • পানির দীর্ঘস্থায়িত্ব: পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ থাকায় বৃষ্টি বা ঢলের পানি নামতে না পেরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বীজতলা জলাবদ্ধ হয়ে পচে যাচ্ছে।

এক নজরে গাইবান্ধার আমন মৌসুম ও ক্ষতির চিত্র:

বিবরণতথ্য ও পরিসংখ্যান
আমন আবাদের মোট লক্ষ্যমাত্রা১,৩৩,১২০ হেক্টর জমি।
প্রস্তুতকৃত মোট বীজতলা৭,০২৫ হেক্টর জমি।
সরকারি হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা১৩২ হেক্টর প্লাবিত (৩৩.৫ হেক্টর সম্পূর্ণ পচনে ধ্বংস)।
রোপণকালশ্রাবণের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্রের মাঝামাঝি।
চাষিদের অতিরিক্ত ব্যয়বিঘা প্রতি চারা কেনা, পরিবহন ও শ্রমিক বাবদ কয়েক হাজার টাকা বৃদ্ধি।

নিঃস্ব কৃষকের আকুতি ও সরকারের প্রণোদনার দাবি

পলাশবাড়ী উপজেলার হরিণাতপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান জানান, আট বিঘা জমির জন্য ২৫ শতকে তৈরি করা বীজতলা টানা এক সপ্তাহ পানির নিচে থেকে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন হাটে হাটে চড়া দামে চারা কিনতে গিয়ে তাঁর হিমশিম অবস্থা।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছী শান্তিরাম গ্রামের কৃষক ওসমান গনি এবং গাইবান্ধা সদরের বল্লমঝাড় ইউনিয়নের বর্গাচাষী সৈয়দ আলী এক সুরে জানান, সার, বিষ, হালচাষ ও চারা কেনার যে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে, তা বর্তমান ধানের বাজারদরে তোলাই অসম্ভব। সরকারি প্রণোদনা না পেলে অনেক ক্ষুদ্র ও বর্গাচাষি এবার ঋণগ্রস্ত হয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবেন।

গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও সার্বিক পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। আগামী রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে সরকারি বীজ ও সার প্রণোদনা প্রদান করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

0 comments on “ধানের বীজতলা পচে নিঃস্ব কৃষক: দ্বিগুণ দামে কেনা চারায় বাড়ছে উৎপাদন খরচ”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাম্প্রতিক লেখা

আর্কাইভ